হাম বা মিজেলস হলো 'রুবেলা' (Rubeola) নামক একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এবং ইউনিসেফ (UNICEF) এর মতে, হাম এতটাই ছোঁয়াচে যে একজন আক্রান্ত শিশু থেকে তার আশেপাশে থাকা টিকা না নেওয়া ১০ জন শিশুর মধ্যে ৯ জনই আক্রান্ত হতে পারে!
হাম কেন বা কীভাবে ছড়ায়?
হাম একটি বায়ুবাহিত এবং অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ। এটি এতটাই দ্রুত ছড়ায় যে একে R₀ (R-naught) এর স্কেলে ১২-১৮ ধরা হয়, যার অর্থ একজন আক্রান্ত শিশু থেকে ১৮ জন সুস্থ শিশু আক্রান্ত হতে পারে!
নিচে হাম এর সংক্রমণের কারন দেওয়া হলো:
-
ড্রপলেট বা বাতাসের মাধ্যমে: যখন একজন আক্রান্ত শিশু কথা বলে, হাঁচি বা কাশি দেয়, তখন তার মুখ ও নাক থেকে ছোট ছোট লালাবিন্দু বা ড্রপলেট বাতাসে মিশে যায়। এই বাতাসে থাকা ভাইরাসের মাধ্যমে আশেপাশে থাকা সুস্থ শিশুরা নিশ্বাসের সাথে আক্রান্ত হয়।
-
ভাইরাসের দীর্ঘস্থায়িত্ব: হামের ভাইরাসের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো এটি বাতাসে বা কোনো জিনিসের পৃষ্ঠে (যেমন: খেলনা, দরজা) প্রায় ২ ঘণ্টা পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারে। অর্থাৎ, আক্রান্ত শিশুটি ঘর থেকে চলে যাওয়ার কিছুক্ষণ পরও অন্য কেউ সেই ঘরে ঢুকলে সংক্রমিত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
শিশুদের হাম হলে কি করণীয়
আপনার শিশুর শরীরে যদি হামের লক্ষণ দেখা দেয়, তবে আতঙ্কিত না হয়ে ধৈর্য ধরে তার সেবা করা জরুরি। মনে রাখবেন, হাম একটি ভাইরাসজনিত রোগ, তাই এর কোনো সরাসরি অ্যান্টিবায়োটিক নেই। সঠিক যত্ন এবং পুষ্টিই শিশুকে দ্রুত সুস্থ করে তুলতে পারে।
১. প্রচুর পরিমাণে তরল ও পানীয়

জ্বরের কারণে শিশুর শরীর থেকে পানি বেরিয়ে যায়। তাই ডিহাইড্রেশন রোধ করতে শিশুকে পর্যাপ্ত পানি, ডাবের পানি, লেবুর শরবত বা ঘরে তৈরি ফলের রস দিন। শিশু যদি বুকের দুধ খায়, তবে তাকে ঘন ঘন দুধ পান করান।
২. পর্যাপ্ত বিশ্রাম ও আইসোলেশন

হামের সময় শরীর খুব দুর্বল হয়ে পড়ে, তাই শিশুকে সম্পূর্ণ বিশ্রামে থাকতে দিন। যেহেতু এটি অত্যন্ত সংক্রামক, তাই অন্য শিশুদের থেকে তাকে আলাদা ঘরে রাখা ভালো। এতে ভাইরাসের সংক্রমণ ছড়ানোর ঝুঁকি কমে।
৩. পুষ্টিকর খাবার ও ভিটামিন-এ
হামের সময় অনেক শিশুর চোখে সমস্যা বা জটিলতা দেখা দেয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এবং ইউনিসেফ পরামর্শ দেয় যে, হামে আক্রান্ত শিশুকে ভিটামিন-এ (Vitamin A) সমৃদ্ধ খাবার দেওয়া অত্যন্ত জরুরি। এটি জটিলতা এবং মৃত্যুঝুঁকি অনেকাংশে কমিয়ে দেয়।
৪. জ্বরের সঠিক ব্যবস্থাপনা
অতিরিক্ত জ্বরের সময় চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্যারাসিটামল সিরাপ দিতে পারেন। তবে ভুলেও শিশুকে অ্যাসপিরিন (Aspirin) জাতীয় ওষুধ দেবেন না, এটি শিশুদের জন্য বিপজ্জনক হতে পারে। শরীর কুসুম গরম পানি দিয়ে স্পঞ্জ করে দিলে শিশু আরাম পাবে।
৫. চোখের যত্ন ও পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা
হাম হলে শিশুর চোখ লাল হয়ে যায় এবং পিচুটি পড়ে। নরম সুতি কাপড় কুসুম গরম পানিতে ভিজিয়ে আলতো করে চোখ পরিষ্কার করে দিন। কড়া আলো থেকে শিশুকে দূরে রাখুন, কারণ এই সময় চোখ আলোর প্রতি সংবেদনশীল থাকে।
শিশুর হামের লক্ষণ কীভাবে চিনবেন
হামের ভাইরাস শরীরে প্রবেশের পর সাধারণত ৭ থেকে ১৪ দিন পর্যন্ত কোনো লক্ষণ প্রকাশ পায় না (যাকে ইনকিউবেশন পিরিয়ড বলা হয়)। তবে এরপর ধাপে ধাপে লক্ষণগুলো স্পষ্ট হতে থাকে:
১. শুরুর দিকের লক্ষণ (Early Stage): প্রথম ৩-৪ দিন শিশুর মধ্যে সাধারণ সর্দি-জ্বরের মতো উপসর্গ দেখা দেয়, যা মায়েরা অনেক সময় ভুল বোঝেন।
-
তীব্র জ্বর: হঠাৎ ১০৩° থেকে ১০৫° ফারেনহাইট পর্যন্ত জ্বর উঠতে পারে।
-
তিনটি 'C': চিকিৎসাবিজ্ঞানে হামের প্রাথমিক লক্ষণকে '3 Cs' বলা হয়— Cough (কাশি), Coryza (তীব্র সর্দি), এবং Conjunctivitis (চোখ লাল হওয়া ও পানি পড়া)।
-
অরুচি ও ক্লান্তি: শিশু খেতে চায় না এবং সারাক্ষণ ঝিমিয়ে থাকে।
২. কোপলিক স্পট (Koplik’s Spots) - নিশ্চিত হওয়ার উপায়: হামের র্যাশ বা দানা বের হওয়ার ২-৩ দিন আগে শিশুর গালের ভেতরের অংশে (মাড়ির কাছে) লবণের দানার মতো ছোট ছোট সাদাটে বা নীলচে-সাদা দাগ দেখা যায়। একে Koplik’s Spots বলে। এটি দেখলে আপনি নিশ্চিত হতে পারেন যে এটি সাধারণ অ্যালার্জি নয়, বরং হাম।
৩. লাল দানা বা র্যাশ বের হওয়া (The Rash Stage): জ্বর শুরুর ৩ থেকে ৫ দিন পর শরীরে দানা দেখা দেয়।
-
শুরু হয় কোথায়: সাধারণত কানের পেছন এবং হেয়ারলাইন (কপাল) থেকে এই লাল দানা শুরু হয়।
-
ছড়িয়ে পড়া: কয়েক দিনের মধ্যে এটি মুখ, ঘাড়, বুক হয়ে সারা শরীরে এবং হাত-পায়ে ছড়িয়ে পড়ে।
-
ধরন: এই দানাগুলো শুরুতে আলাদা থাকলেও পরে একে অপরের সাথে মিশে গিয়ে বড় লাল ছোপ তৈরি করতে পারে। দানা বের হওয়ার সময় জ্বর আরও বেড়ে যেতে পারে।
৪. সেরে ওঠার লক্ষণ: প্রায় ৫-৬ দিন পর এই দানাগুলো কালচে হয়ে যেতে থাকে এবং আস্তে আস্তে চামড়া উঠতে শুরু করে। সাধারণত এই সময়ে জ্বর কমে আসে।
হাম হলে কি কি খাওয়া যায় এবং কি খাওয়া যায় না?
হামের সময় শিশুর শরীর খুব দুর্বল থাকে, তাই কোন খাবারগুলো তাকে সুস্থ করবে আর কোনগুলো ক্ষতি করতে পারে নিচে চার্ট দেওয়া হল:
|
খাবারের ধরণ
|
কী কী খাওয়ানো যাবে |
কী কী এড়িয়ে চলবেন
|
কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ?
|
| পানীয় ও তরল |
পর্যাপ্ত সাধারণ পানি, ডাবের পানি, ওরাল স্যালাইন (ORS), এবং পাতলা ফলের রস।
|
ফ্রিজের অতিরিক্ত ঠান্ডা পানি, আইসক্রিম বা বাজারের প্যাকেটজাত কালারফুল জুস। |
জ্বরের কারণে হওয়া Dehydration বা পানিশূন্যতা রোধ করে।
|
| প্রধান খাবার |
সহজে হজম হয় এমন নরম খিচুড়ি, জাউ ভাত, সুজি বা ওটস।
|
অতিরিক্ত তেল-মসলাযুক্ত খাবার, বিরিয়ানি বা বাইরের ভাজাপোড়া। |
অসুস্থ অবস্থায় হজম শক্তি কমে যায়, তাই হালকা খাবার জরুরি।
|
|
সবজি ও ফল
|
গাজর, মিষ্টি কুমড়া, পাকা পেঁপে, মিষ্টি আলু এবং পালং শাক।
|
শক্ত কাঁচা সবজি বা ফল যা গিলতে শিশুর কষ্ট হতে পারে। |
এগুলোতে প্রচুর Vitamin A থাকে যা হামের জটিলতা কমায়। |
| ভিটামিন-সি |
লেবুর শরবত, মাল্টা বা কমলার রস (কুসুম গরম পানিতে মিশিয়ে)।
|
টক জাতীয় অতিরিক্ত কড়া আচার বা ঝাল চাটনি।
|
Immunity বা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়িয়ে দ্রুত সেরে উঠতে সাহায্য করে।
|
| প্রোটিন |
সেদ্ধ ডিমের কুসুম, পাতলা ডাল, মুরগির স্যুপ বা ছোট মাছ। |
অতিরিক্ত শক্ত মাংস বা খুব বেশি চর্বিযুক্ত খাবার।
|
শরীরের টিস্যু মেরামত এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে। |
হাম প্রতিরোধের উপায়
হাম একটি প্রতিরোধযোগ্য রোগ। সঠিক সময়ে ব্যবস্থা নিলে আপনার সোনামণিকে এই কষ্টদায়ক সংক্রমণ থেকে পুরোপুরি রক্ষা করা সম্ভব। নিচে প্রধান প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থাগুলো আলোচনা করা হলো:
১. এমআর (MR/MMR) টিকা: সবচেয়ে কার্যকর উপায়
হাম প্রতিরোধের একমাত্র এবং সবচেয়ে শক্তিশালী উপায় হলো সময়মতো শিশুকে টিকা দেওয়া। বাংলাদেশে সরকারি ইপিআই (EPI) কর্মসূচির আওতায় এই টিকা বিনামূল্যে দেওয়া হয়।
-
প্রথম ডোজ: শিশুর বয়স ৯ মাস পূর্ণ হলে।
-
দ্বিতীয় ডোজ: শিশুর বয়স ১৫ মাস পূর্ণ হলে।
-
মনে রাখবেন: এই দুটি ডোজ সম্পন্ন করলে শিশুর শরীরে হামের বিরুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদী রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়।
২. হার্ড ইমিউনিটি (Herd Immunity) নিশ্চিত করা
একটি এলাকার অন্তত ৯৫% শিশু যদি হামের টিকা নেয়, তবে সেই এলাকায় ভাইরাসটি ছড়াতে পারে না। একেই বলা হয় হার্ড ইমিউনিটি। তাই আপনার সন্তানকে টিকা দেওয়ার পাশাপাশি আশেপাশে অন্য মায়েদেরও সচেতন করা জরুরি।
৩. আক্রান্ত শিশু থেকে দূরত্ব বজায় রাখা
যেহেতু এটি একটি বায়ুবাহিত রোগ, তাই আশেপাশে কারো হাম হলে নিচের সতর্কতাগুলো মেনে চলুন:
-
আক্রান্ত শিশুকে আলাদা ঘরে রাখুন (Isolation)।
-
শিশুর ব্যবহৃত থালা-বাসন, গ্লাস বা তোয়ালে অন্য কেউ ব্যবহার করবেন না।
-
ঘরের জানালা খোলা রাখুন যাতে পর্যাপ্ত বাতাস চলাচল (Ventilation) করতে পারে। এতে বাতাসে ভাইরাসের ঘনত্ব কমে যায়।
৪. ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা
বাইরে থেকে এসে বা শিশুকে খাবার খাওয়ানোর আগে হাত সাবান দিয়ে ভালো করে ধুয়ে নিন। শিশুকে শেখান যেন সে মুখে বা চোখে নোংরা হাত না দেয়।
কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন?
হাম সাধারণত ঘরে যত্নেই সেরে যায়, তবে কিছু লক্ষণ দেখলে এক মুহূর্ত দেরি না করে ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে:
-
যদি জ্বর ১০৪° ফারেনহাইটের উপরে চলে যায় এবং না কমে।
-
শিশুর শ্বাস নিতে কষ্ট হলে বা বুক দেবে গেলে (নিউমোনিয়ার লক্ষণ)।
-
যদি শিশু প্রচণ্ড বমি করে বা একদমই খেতে না পারে।
-
কানে ব্যথা হলে বা কান দিয়ে পুঁজ পড়লে।
-
শিশুর ঘাড় শক্ত হয়ে গেলে বা খিঁচুনি দেখা দিলে।
উপসংহার
হাম একটি সংক্রামক রোগ হলেও সঠিক যত্ন, পুষ্টি এবং সময়মতো টিকাদানের মাধ্যমে আপনার সোনামণিকে এর থেকে নিরাপদ রাখা সম্ভব। শিশুর শরীরে কোনো অস্বাভাবিক লক্ষণ দেখলে দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন এবং ঘরে বসে তাকে পর্যাপ্ত সময় ও ভালোবাসা দিন। মনে রাখবেন, আপনার সচেতনতাই পারে একটি শিশুকে সুস্থ ও সুন্দর ভবিষ্যৎ উপহার দিতে।
FAQ
হাম কত দিনে ভালো হয়?
সাধারণত হামের লক্ষণ দেখা দেওয়ার পর ৭ থেকে ১০ দিনের মধ্যে শিশু সুস্থ হয়ে ওঠে। তবে শরীরের লাল দানা বা র্যাশগুলো পুরোপুরি মিলিয়ে যেতে এবং শিশুর ধকল কাটিয়ে উঠতে ২ সপ্তাহ পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। এই সময়ে পর্যাপ্ত বিশ্রাম এবং পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিত করা জরুরি।
হাম হলে কি শিশুকে গোসল করানো যাবে?
হ্যাঁ, অবশ্যই। হাম হলে শিশুকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা খুব জরুরি। কুসুম গরম পানি দিয়ে আলতো করে শরীর স্পঞ্জ করে দিলে বা গোসল করালে শিশুর গায়ের অস্বস্তি ও চুলকানি কমে। তবে খেয়াল রাখবেন যেন শিশুর ঠান্ডা না লাগে। গোসলের পর শরীর ভালোভাবে মুছে শুকনো কাপড় পরিয়ে দিন।
হাম কি ছোঁয়াচে রোগ?
হ্যাঁ, হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক বা ছোঁয়াচে ভাইরাসজনিত রোগ। এটি বাতাসের মাধ্যমে (হাঁচি-কাশির ড্রপলেট) এবং আক্রান্ত শিশুর সরাসরি সংস্পর্শে ছড়ায়। এমনকি আক্রান্ত শিশু ঘর থেকে চলে যাওয়ার ২ ঘণ্টা পরও সেই ঘরে ভাইরাসটি সক্রিয় থাকতে পারে। তাই আক্রান্ত শিশুকে অন্য শিশুদের থেকে আলাদা রাখাই বুদ্ধিমানের কাজ।
হাম হলে কি কি খাবার এড়িয়ে চলা উচিত?
হাম হলে বিশেষ কোনো খাবার একেবারে নিষিদ্ধ নয়, তবে শিশুর হজম শক্তি কমে যায় বলে অতিরিক্ত তেল-মসলাযুক্ত খাবার, ভাজাপোড়া এবং বাইরের প্রসেসড ফুড এড়িয়ে চলা ভালো। এছাড়া খুব ঠান্ডা পানীয় বা আইসক্রিম দেবেন না, কারণ এতে কাশির সমস্যা বেড়ে যেতে পারে।
একবার হাম হলে কি আবারও হতে পারে?
সাধারণত একবার হাম হলে শরীরে এই ভাইরাসের বিরুদ্ধে স্থায়ী রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা (Immunity) তৈরি হয়। তাই দ্বিতীয়বার হাম হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় নেই বললেই চলে। তবে শিশুকে সঠিক সময়ে MR বা MMR টিকা দেওয়া থাকলে এই ঝুঁকি পুরোপুরি দূর হয়।