মেডিকেল পরিভাষায়, আমাদের লিভারের প্রদাহকে হেপাটাইটিস বলা হয়। যখন কোনো ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া বা অন্য কোনো ক্ষতিকর উপাদানের কারণে লিভারের কোষে বা টিস্যুতে প্রদাহ বা ইনফ্লামেশন তৈরি হয়, তখন তাকে হেপাটাইটিস বলে। লিভার আমাদের শরীরের হজম প্রক্রিয়া, রক্ত পরিশোধন এবং শক্তি সঞ্চয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো করে। কিন্তু হেপাটাইটিসে আক্রান্ত হলে লিভার ফুলে যায় এবং তার স্বাভাবিক কাজ করার ক্ষমতা ধীরে ধীরে হারাতে থাকে।
হেপাটাইটিস কত প্রকার ও কি কি?
হেপাটাইটিস মূলত দুই মেয়াদের হতে পারে একিউট' (স্বল্পমেয়াদী) এবং 'ক্রনিক' (দীর্ঘমেয়াদী)। তবে কারণের ওপর ভিত্তি করে হেপাটাইটিসকে প্রধানত ৫টি ভাগে ভাগ করা হয়:
-
হেপাটাইটিস বি (Hepatitis B): এটি সবচেয়ে বিপজ্জনক রূপগুলোর একটি। হেপাটাইটিস বি ভাইরাস কি তা যদি এক লাইনে বলি—এটি এমন একটি ডিএনএ ভাইরাস (এইচবিভি), যা রক্ত, লালা বা আক্রান্ত ব্যক্তির শরীরের তরলের মাধ্যমে ছড়ায়। এটি ক্রনিক রূপ নিলে লিভারের স্থায়ী ক্ষতি করতে পারে।
হেপাটাইটিস কেন হয়?
মেডিকেল বিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে হেপাটাইটিস হওয়ার সুনির্দিষ্ট কিছু কারণ রয়েছে। মূলত বিভিন্ন ক্ষতিকর ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া, পরজীবী কিংবা অস্বাচ্ছদ্যকর জীবনযাত্রার নেতিবাচক প্রভাবে যখন আমাদের লিভারের কোষে বা টিস্যুতে প্রদাহ তৈরি হয়, তখনই হেপাটাইটিস রোগটি প্রকাশ পায়। চিকিৎসাবিজ্ঞান অনুযায়ী, হেপাটাইটিস হওয়ার কারণগুলোকে প্রধানত দুটি ভাগে ভাগ করা যায়: একটি হলো ভাইরাল কারণ এবং অন্যটি হলো নন-ভাইরাল কারণ।
ভাইরাল ইনফেকশন
হেপাটাইটিস এ, বি, সি, ডি এবং ই ভাইরাসের সংক্রমণই বিশ্বজুড়ে এই রোগের সবচেয়ে বড় কারণ। এর মধ্যে
টক্সিক ও ড্রাগ-ইনডিউসড হেপাটাইটিস
অতিরিক্ত অ্যালকোহল বা মদ্যপান এবং চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অতিরিক্ত মাত্রায় ব্যথানাশক (প্যারাসিটামল, পেইনকিলার) বা অ্যান্টিবায়োটিক সেবন করলে লিভারের কোষ বিষাক্ত হয়ে প্রদাহ তৈরি হয়।
অটোইমিউন হেপাটাইটিস
যখন শরীরের নিজস্ব রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ভুলবশত লিভারের সুস্থ কোষগুলোকে শত্রু ভেবে আক্রমণ করে, তখন তাকে অটোইমিউন হেপাটাইটিস বলে।
লিভারের প্রদাহ ও ফ্যাটি লিভারের অন্যান্য ঝুঁকি
ভাইরাসের পাশাপাশি আমাদের দৈনন্দিন কিছু ভুল অভ্যাস লিভারের কার্যক্ষমতা ধ্বংস করতে এবং পরোক্ষভাবে লিভারের টিস্যুতে দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি তৈরি করতে বড় ভূমিকা রাখে:
-
অস্বাস্থ্যকর খাবার ও অতিরিক্ত ওজন: মাত্রাতিরিক্ত ফাস্টফুড, প্রক্রিয়াজাত ও চর্বিযুক্ত অস্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়ার ফলে লিভারে অতিরিক্ত চর্বি জমতে শুরু করে (ফ্যাটি লিভার)। এর সাথে শরীরে অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতা থাকলে লিভারের স্বাভাবিক মেটাবলিজম ব্যাহত হয়, যা পরবর্তীতে লিভারের কোষে ক্রনিক প্রদাহ বা নন-অ্যালকোহলিক স্টিয়াটোহেপাটাইটিস (NASH) এর ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
হেপাটাইটিস বি এর লক্ষণ
হেপাটাইটিস বি-কে চিকিৎসকেরা প্রায়ই 'নীরব ঘাতক' বা Silent Killer বলে থাকেন। এর কারণ হলো, হেপাটাইটিস বি ভাইরাস কি বা এটি শরীরে কীভাবে কাজ করে তা অনেকেই প্রথম দিকে টের পান না; এই ভাইরাস শরীরে প্রবেশের পর মাসের পর মাস, এমনকি বছরের পর বছর কোনো বড় ধরণের উপসর্গ ছাড়াই লুকিয়ে থাকতে পারে।
সাধারণত হেপাটাইটিস বি এর লক্ষণগুলোকে দুটি অবস্থাতে ভাগ করে বোঝা যায়:
হেপাটাইটিস বি এর প্রাথমিক লক্ষণসমূহ (Acute Symptoms)
ভাইরাসটি শরীরে প্রবেশ করার সাধারণত ১ থেকে ৪ মাসের মধ্যে লক্ষণগুলো প্রকাশ পেতে শুরু করে:
ক্রনিক বা দীর্ঘমেয়াদী হেপাটাইটিস বি এর লক্ষণ (Chronic Symptoms)
যদি কোনো ব্যক্তির শরীরে এই ভাইরাসটি ৬ মাসের বেশি সময় ধরে স্থায়ী হয়, তবে তাকে ক্রনিক হেপাটাইটিস বি বলে। এই স্টেজে আক্রান্ত ব্যক্তিদের শরীরে বছরের পর বছর কোনো বাইরের লক্ষণ নাও থাকতে পারে। তবে ভেতরে ভেতরে লিভারের টিস্যুতে প্রদাহ চলতে থাকে:
-
লিভার ক্যান্সার (Liver Cancer): সঠিক সময়ে চিকিৎসা না হলে ক্রনিক ইনফেকশন সরাসরি লিভার ক্যান্সার-এ রূপ নিতে পারে, যার লক্ষণ হিসেবে দ্রুত ওজন হ্রাস, জন্ডিস বেড়ে যাওয়া এবং পেটে চাকা বা টিউমার অনুভূত হতে পারে।
হেপাটাইটিস বি হলে করণীয়
বাংলাদেশে প্রায় ৫-৭% মানুষ হেপাটাইটিস বি বহন করেন (DGDA/WHO তথ্য)। রক্ত পরীক্ষার (HBsAg) মাধ্যমে যদি কারো শরীরে হেপাটাইটিস বি ভাইরাস বা এইচবিভি (HBV) ধরা পড়ে, তবে শুরুতেই প্যানিক বা আতঙ্কিত হওয়া যাবে না। সঠিক সময়ে সঠিক পদক্ষেপ নিলে এই রোগটি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। হেপাটাইটিস বি এর লক্ষণ ও প্রতিকার নিশ্চিতে আপনার প্রথম করণীয়গুলো হলো:
লিভার বিশেষজ্ঞের (Hepatologist) পরামর্শ নেওয়া
রিপোর্ট আসার পজিটিভ সাথে সাথেই একজন লিভার বিশেষজ্ঞ দেখান। তিনি কিছু ফলো-আপ টেস্টের (যেমন: Liver Function Test, FibroScan) মাধ্যমে নির্ধারণ করবেন আপনার রোগটি কোন পর্যায়ে আছে।
পরিবারের সবাইকে স্ক্রিনিং ও ভ্যাকসিন দেওয়া
হেপাটাইটিস বি যেহেতু রক্তের মাধ্যমে ছড়ায়, তাই পরিবারের বাকি সদস্যদের অবিলম্বে রক্ত পরীক্ষা করাতে হবে। তাদের রিপোর্ট নেগেটিভ আসলে দ্রুত হেপাটাইটিস বি-এর ভ্যাকসিন দেওয়া নিশ্চিত করুন।
জীবনযাত্রায় পরিবর্তন আনা
লিভারের ওপর বাড়তি চাপ কমাতে একটি নিয়মতান্ত্রিক লাইফস্টাইল মেইনটেইন করা অত্যন্ত জরুরি:
- অস্বাস্থ্যকর খাবার বর্জন: অতিরিক্ত তেল, চর্বি, ফাস্টফুড খাওয়া একদম বন্ধ করতে হবে।
- অতিরিক্ত ওজন নিয়ন্ত্রণ: শরীরে অতিরিক্ত ওজন থাকলে তা লিভারের কার্যক্ষমতা কমিয়ে দেয়, তাই ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে।
- অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন পরিহার: রাত জাগা পরিহার করে প্রতিদিন ৭-৮ ঘণ্টা পর্যাপ্ত ঘুমানো নিশ্চিত করতে হবে।
ওষুধ সেবনে সতর্কতা অবলম্বন
চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন ছাড়া যেকোনো ধরণের ওষুধ বা পেইনকিলার খাওয়া থেকে বিরত থাকুন। কারণ যেকোনো ওষুধ লিভারের ক্ষতি আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
রক্ত ও ব্যক্তিগত জিনিসপত্র শেয়ার না করা
আপনার ব্যবহৃত টুথব্রাশ, রেজার, নেইল কাটার বা সুঁই অন্য কাউকে ব্যবহার করতে দেবেন না। এসব ব্যক্তিগত জিনিসে অল্প পরিমাণ রক্ত বা জীবাণু থাকতে পারে, যা একজন থেকে আরেকজনের শরীরে সংক্রমণ ছড়াতে পারে। তাই নিজের ব্যবহারের জিনিস আলাদা রাখুন
হেপাটাইটিস বি এর চিকিৎসা
হেপাটাইটিস বি হওয়া মানেই লিভার নষ্ট হয়ে যাওয়া এই ধারণাটি সম্পূর্ণ ভুল। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের কল্যাণে হেপাটাইটিস বি এখন চমৎকারভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। রক্ত পরীক্ষা ও লিভারের কন্ডিশন দেখে চিকিৎসকেরা মূলত দুইভাবে এর চিকিৎসা দিয়ে থাকেন:
অ্যাকিউট হেপাটাইটিস বি (Acute Hepatitis B)
যদি সংক্রমণটি প্রাথমিক বা একিউট পর্যায়ের হয়, তবে সাধারণত কোনো বিশেষ অ্যান্টিভাইরাল ওষুধের প্রয়োজন হয় না। মানুষের শরীরের নিজস্ব রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাই ৯০%-এর বেশি ক্ষেত্রে এই ভাইরাসটিকে শরীর থেকে সম্পূর্ণ দূর করে দিতে পারে। এই সময়ে পর্যাপ্ত বিশ্রাম, হাইড্রেটেড থাকা এবং লিভার ফ্রেন্ডলি খাবার খাওয়াই মূল চিকিৎসা।
ক্রনিক হেপাটাইটিস বি (Chronic Hepatitis B)
যদি ভাইরাসটি শরীরে ৬ মাসের বেশি সময় ধরে সক্রিয় থাকে, তবে তাকে ক্রনিক ইনফেকশন বলা হয়। এটি লিভার ড্যামেজ, লিভার সিরোসিস বা লিভার ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়।
-
অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ: যদি ভাইরাসটি লিভারের ক্ষতি করতে থাকে, তবে চিকিৎসকরা দীর্ঘমেয়াদী অ্যান্টিভাইরাল ট্যাবলেট (যেমন: Tenofovir, Entecavir) প্রেসক্রাইব করেন। এই ওষুধগুলো ভাইরাসকে সম্পূর্ণ নির্মূল করতে না পারলেও এর বংশবৃদ্ধি থামিয়ে লিভারকে সুরক্ষিত রাখে।
হেপাটাইটিস বি প্রতিরোধ
"Prevention is better than cure" অর্থাৎ প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধই শ্রেয়। সামান্য কিছু সচেতনতা আপনাকে এবং আপনার পরিবারকে এই নীরব ঘাতকের হাত থেকে সারাজীবন সুরক্ষিত রাখতে পারে।
- নতুন সূঁচ-সিরিঞ্জ ব্যবহার: যেকোনো ইনজেকশন বা রক্ত পরীক্ষার সময় সবসময় নতুন এবং ওয়ান-টাইম (Disposable) সুঁই ও সিরিঞ্জ ব্যবহার নিশ্চিত করুন।
শেষ কথা
আমাদের শরীরের পাওয়ার হাউজ বলা হয় লিভারকে। অথচ আমাদের সামান্য অসচেতনতা, অস্বাস্থ্যকর খাবার, কিংবা অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন এই লিভারকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিতে পারে। হেপাটাইটিস বি কোনো সাধারণ জন্ডিস নয়, এটি অবহেলা করলে সিরোসিস কিংবা লিভার ক্যান্সার-এর মতো প্রাণঘাতী রূপ নিতে পারে।
FAQ
হেপাটাইটিস বি ভাইরাস কি ছোঁয়াচে?
হ্যাঁ, হেপাটাইটিস বি একটি অত্যন্ত সংক্রামক বা ছোঁয়াচে রোগ। তবে এটি হাঁচি, কাশি, কোলাকুলি বা একসাথে খাওয়ার মাধ্যমে ছড়ায় না। এটি মূলত আক্রান্ত ব্যক্তির রক্ত, বীর্য বা অন্যান্য বডি ফ্লুইড সরাসরি অন্য কোনো সুস্থ মানুষের রক্তে প্রবেশ করলে ছড়ায়।
সবচেয়ে মারাত্মক হেপাটাইটিস ভাইরাস কোনটি?
হেপাটাইটিস ভাইরাসের মধ্যে হেপাটাইটিস বি (HBV) এবং হেপাটাইটিস সি (HCV) সবচেয়ে মারাত্মক। কারণ এই দুটি ভাইরাস লিভারে দীর্ঘমেয়াদী বা ‘ক্রনিক’ সংক্রমণ তৈরি করে, যা পরবর্তীতে কোনো বড় লক্ষণ ছাড়াই লিভার সিরোসিস এবং লিভার ক্যান্সারের মতো প্রাণঘাতী রোগের প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
হেপাটাইটিস বি হলে কি খাওয়া উচিত?
হেপাটাইটিস বি হলে লিভারের ওপর চাপ কমায় এমন সহজপাচ্য এবং পুষ্টিকর খাবার খাওয়া উচিত।
-
যা খাবেন: প্রচুর পরিমাণে সবুজ শাকসবজি, তাজা ফলমূল, সহজে হজম হয় এমন ভাত-মাছ, পর্যাপ্ত নিরাপদ ও ফুটানো পানি, এবং ডাবের পানি।
নীরব হেপাটাইটিস কোনটি?
হেপাটাইটিস বি এবং হেপাটাইটিস সি-কে ‘নীরব হেপাটাইটিস’ বা নীরব ঘাতক বলা হয়। এর কারণ হলো, এই ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার পর শরীরের ভেতরে ভেতরে এটি লিভারকে পুরোপুরি অকেজো করতে থাকে কিন্তু বছরের পর বছর কোনো ধরণের বাইরের লক্ষণ বা উপসর্গ প্রকাশ পায় না।
হেপাটাইটিস রোগে কোন অঙ্গ বেশি আক্রান্ত হয়?
হেপাটাইটিস রোগে মানুষের শরীরের অন্যতম প্রধান অঙ্গ লিভার (Liver) বা যকৃত সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়। ‘হেপাটাইটিস’ শব্দটির অর্থই হলো লিভারের প্রদাহ বা ইনফ্লামেশন।
হেপাটাইটিস হলে কিডনি না লিভার হয়?
হেপাটাইটিস মূলত লিভারের রোগ, কিডনির নয়। তবে হেপাটাইটিস বি বা সি ভাইরাস যদি দীর্ঘমেয়াদী (ক্রনিক) রূপ নেয়, তবে তা পরোক্ষভাবে শরীরের অন্যান্য অঙ্গের ক্ষতি করতে পারে এবং কখনো কখনো কিডনি বিকল হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। কিন্তু প্রাথমিকভাবে এটি শতভাগ লিভারের রোগ।