সানস্ক্রিন ব্যবহারের নিয়ম: কি করবেন ও কি করবেন না
August 19, 2026
August 19, 2026
কড়া রোদ মানে শুধু হাঁসফাঁস গরম নয়, এর পেছনে লুকিয়ে আছে ত্বকের বড় শত্রু—সূর্যের ক্ষতিকর UVA ও UVB রশ্মি। সকালে তড়িঘড়ি করে অফিসে ছুটা, দুপুরে হুডখোলা রিকশায় থাকা, স্কুল থেকে সন্তানকে বাড়ি ফিরিয়ে আনা কিংবা বিকালের বাজার করতে বের হওয়া—দিনের এই চেনা মুহূর্তগুলোতেই আমাদের ত্বক নীরবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকে।
ত্বক বাঁচাতে অনেকেই এখন নিয়মিত সানস্ক্রিন কেনার অভ্যাস করছেন। তবে ব্যবহার করার ক্ষেত্রেই ঘটে সবচেয়ে বেশি ভুল। কেউ মুখে মাত্র কয়েক ফোঁটা লাগান, কেউ শুধু খুব রোদ থাকলেই ব্যবহার করেন, আবার কেউ সকালে একবার লাগিয়ে ধরে নেন সারাদিনের কাজ শেষ। আর দামি সানস্ক্রিন হলে আরেক চিন্তা—বেশি করে লাগালে দ্রুত শেষ হয়ে যাবে! এই ভয়েই নামমাত্র ব্যবহার করেন।
কিন্তু সানস্ক্রিন থেকে ভালো সুরক্ষা পেতে শুধু ভালো ব্র্যান্ড বা বেশি SPF বেছে নিলেই হবে না। জানতে হবে এর সঠিক ব্যবহার ও।
কড়া রোদ থাকুক কিংবা মেঘলা আকাশ—প্রতিদিন সকালে দিন শুরুর আগেই সানস্ক্রিন মাখা জরুরি। সূর্যের ক্ষতিকর UV রশ্মি কেবল গরমকালেই নয়, সারা বছরই ত্বকে পৌঁছাতে পারে। । এমনকি মেঘলা দিনেও প্রায় ৮০% শতাংশ রশ্মি মেঘ ভেদ করে সোজা আমাদের ত্বকে এসে আঘাত করতে পারে। । তাই সকালে বাসা থেকে বের হওয়ার আগে মুখের পাশাপাশি কান, গলা, ঘাড় ও হাতের মতো উন্মুক্ত অংশগুলোতে ভালোভাবে সানস্ক্রিন মেখে নেওয়া উচিত।
অনেকে ভাবেন ঘরে থাকলে বোধ হয় সানস্ক্রিনের আর দরকার নেই। ভুল ধারণা! ঘরের জানালার কাচ বা বেলকনি ভেদ করে সূর্যের UVA রশ্মি অনায়াসে ভেতরে চলে আসে, যা ত্বকে অকাল বার্ধক্য আর বলিরেখা ফেলার জন্য দায়ী। ঘরে থাকলে SPF 30 মানের হালকা ও নন-গ্রিজি (Non-greasy) যেকোনো সানস্ক্রিন সকালে একবার লাগিয়ে নিলেই ত্বক থাকবে সুরক্ষিত।
সানস্ক্রিন ব্যবহারে আমাদের সবচেয়ে বড় ভুলটা হয় পরিমাণে। অনেকেই ভাবেন, মুখে কয়েক ফোঁটা দিলেই কাজ হয়ে যাবে। কিন্তু SPF পরীক্ষার সময় ল্যাবে প্রতি বর্গসেন্টিমিটার ত্বকে প্রায় ২ মিলিগ্রাম বা 2 mg/cm² সানস্ক্রিন ব্যবহার করা হয়। বাস্তবে আমরা সাধারণত এর চেয়ে অনেক কম লাগাই। ফলে বোতলে SPF 50 লেখা থাকলেও ত্বক সেই পরিমাণ সুরক্ষা নাও পেতে পারে।
এখন প্রশ্ন হলো, মেপে মেপে 2 mg/cm² সানস্ক্রিন মাখা কি সম্ভব? ঝামেলা এড়াতে সহজ একটি নিয়ম হলো টু-ফিঙ্গার রুল। আপনার হাতের তর্জনী ও মধ্যমা—এই দুই আঙুলের ওপরের ভাঁজ থেকে ডগা পর্যন্ত লম্বা করে দুটি লাইনে সানস্ক্রিন নিন। তারপর মুখ, কান ও গলার খোলা অংশেও মেখে নিন। আর সমুদ্রসৈকত, সাঁতার বা এমন কোনো জায়গায় গেলে যেখানে শরীরের বেশিরভাগ অংশ খোলা থাকে, একজন গড়পড়তা প্রাপ্তবয়স্কের জন্য প্রায় ৩০ মিলিলিটার (ছোট shot glass সমান) পরিমাণ সানস্ক্রিন মেখে নিতে হবে।
NOTE: টু-ফিঙ্গার রুলের পেছনেও হিসাব আছে। ত্বকের নির্দিষ্ট অংশে ল্যাব পরীক্ষার 2 mg/cm²-এর কাছাকাছি পরিমাণ সানস্ক্রিন সহজে মাপার উপায় হিসেবে এই পদ্ধতি প্রস্তাব করা হয়েছিল। তবে দুই আঙুলের পরিমাণ সবার ক্ষেত্রে একেবারে একই হবে না। আঙুলের দৈর্ঘ্য, সানস্ক্রিন কতটা ঘন এবং বোতলের মুখ কতটা চওড়া—এসব কারণে সামান্য পার্থক্য হতে পারে।
কোন সানস্ক্রিন ব্যবহার করবেন
SPF 30, SPF 50, মিনারেল, কেমিক্যাল, জেল বা ক্রিম—এত রকমারি সানস্ক্রিন দেখে বিভ্রান্ত হওয়াটাই স্বাভাবিক। বিষয়টি আসলে খুব জটিল নয়।
SPF 30 : সকালে অফিসে যাওয়া, কলেজে যাওয়া বা বাসায় থাকার সময়। হালকা রোদে অল্প সময়ের কাজের জন্য SPF 30 যথেষ্ট ।
SPF 50 : ঘুরতে যাওয়া, মাঠে খেলাধুলা করা, কিংবা দুপুরবেলা দীর্ঘক্ষণ বাইরে বা রিকশায় যাতায়াত, সমুদ্রসৈকত বা সাঁতারের মতো পরিস্থিতিতে এটি বেছে নিন। যাদের ত্বক খুব সহজে পুড়ে যায় বা মেচেতা/দাগের সমস্যা আছে তাদের বাড়তি সুরক্ষার দিবে SPF 50 ।
সবার ত্বকের গড়ন এক নয়, তাই ভুল সানস্ক্রিন বেছে নিলে মুখ তেলতেলে লাগতে পারে কিংবা ব্রণ উঠতে পারে। ত্বকের মেজাজ বুঝে সঠিক টেক্সচার বেছে নিলেই প্রতিদিন সানস্ক্রিন মাখা সহজ হবে।
তৈলাক্ত বা ব্রণপ্রবণ ত্বক: ভারী ক্রিম মেখে মুখ ঘামার ভয় থাকলে লাইটওয়েট Gel, Fluid বা Aqua/Water-based সানস্ক্রিন কিনুন। পোরস বন্ধ হওয়ার প্রবণতা কমাতে non-comedogenic formula বেছে নিন।
শুষ্ক ত্বক: শুষ্ক ত্বকে বাড়তি আর্দ্রতা দরকার। তাই Cream-based সানস্ক্রিন বেছে নিন, যাতে হাইয়ালুরোনিক এসিড বা সেরামাইড আছে।
সেনসিটিভ ত্বক: একটুতেই ত্বক লাল হওয়া বা জ্বালাপোড়া করার অভ্যাস থাকলে Mineral/Physical Sunscreen (যাতে Zinc oxide বা Titanium dioxide থাকে) ব্যবহার করুন। অবশ্যই ‘Fragrance-free’ বা সুগন্ধিহীন পণ্য বেছে নেবেন।
আপনার ত্বকের ধরন অনুযায়ী সানস্ক্রিন বেছে নিতে পড়ুনঃ Top 10 Best Sunscreen in Bangladesh 2026: Picks by Skin Type
সানস্ক্রিন শুধু লাগালেই হবে না, সঠিকভাবে লাগানোও জরুরি।
সকালে একবার সানস্ক্রিন লাগালেই সারাদিনের সুরক্ষা নিশ্চিত হয় না। বাইরে দীর্ঘ সময় থাকলে সাধারণভাবে প্রতি দুই ঘণ্টা পরপর সানস্ক্রিন আবার লাগানো ভালো। আর সাঁতার, অতিরিক্ত ঘাম বা তোয়ালে দিয়ে মুখ মুছলে দুই ঘণ্টা অপেক্ষা না করেই পুনরায় ব্যবহার করতে হবে। বাংলাদেশি বাস্তবতায় ২ ঘণ্টা পর পর নতুন করে সানস্ক্রিন মাখাটা শুনতে যতটা সহজ, বাস্তবে ততটাই কঠিন। প্রচণ্ড গরম, জ্যামের ধুলোবালি, মেকআপ নষ্ট হওয়ার ভয় আর পানির অভাব—সব মিলে এটি একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এক্ষেত্রে স্টিক বা স্প্রে দিয়ে খুব সহজেই মেকআপ বা ঘেমে যাওয়া মুখের ওপর ঝটপট টাচ-আপ দেওয়া যায়।
শিশুদের ত্বক পূর্ণবয়স্কদের চেয়ে অনেক বেশি পাতলা ও সংবেদনশীল। তাই শিশুদের রোদ থেকে বাঁচাতে বয়সভেদে কিছু আলাদা নিয়ম মানতে হয়।
৬ মাসের কম শিশুর প্রথম সুরক্ষা ছায়া ও পোশাক। এই বয়সে যেকোনো সানস্ক্রিন এড়িয়ে চলাই ভালো।
শিশুকে সরাসরি রোদে না রেখে ছায়ায় রাখুন (ছাতা, স্টোলার বা ক্যানোপি ব্যবহার করুন)।
সুতির পাতলা, হাত-পা ঢাকা পোশাক এবং চওড়া কিনারার টুপি পরান।
কোনোভাবেই যদি রোদ এড়ানো না যায়, তবে শরীরের উন্মুক্ত অংশে সামান্য Mineral Sunscreen লাগানো যেতে পারে।
পোশাকের বাইরে থাকা ত্বকে SPF 30 বা তার বেশি, Broad-spectrum এবং Water-resistant সানস্ক্রিন মাখাতে পারেন।
বড়দের মতো ছোটদেরও বাইরে থাকলে প্রতি ২ ঘণ্টা পর পর এবং সাঁতার কাটলে বা ঘামার পর সানস্ক্রিন আবার লাগিয়ে দিতে হবে।
আমরা প্রতিদিন নিয়ম করে সানস্ক্রিন মেখেও অনেক সময় আশানুরূপ ফলাফল পাই না। এর নেপথ্যে থাকে এমন কিছু ছোটখাটো ভুল, যা আমরা সাধারণত খেয়ালই করি না। চলুন জানি এমন ৫টি ভুল যা আমরা অহরহ করে থাকি।
মুখ ধোয়ার পরপরই ত্বক না শুকিয়ে সানস্ক্রিন লাগালে বা ঘেমে থাকা মুখে ডলে নিলে এটি ত্বকে না বসে পাতলা হয়ে ভেসে থাকে। এতে সানস্ক্রিনের আসল সুরক্ষাবলয় তৈরি হয় না। তাই মুখ ভালোভাবে শুকানোর পরেই এটি ব্যবহার করা উচিত।
সানস্ক্রিন কোনো ময়েশ্চারাইজার নয় যে ত্বকের ভেতরে ডলে ঢুকিয়ে দিতে হবে। খুব বেশি ঘষাঘষি করলে এর প্রটেক্টিভ লেয়ারটি অসমান (uneven) হয়ে যায়। তাই আঙুল দিয়ে আলতোভাবে মুখে সমানভাবে ছড়িয়ে দেওয়াই সঠিক পদ্ধতি।
সানস্ক্রিনের বোতল বা টিউবের গায়ে লেখা মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে কিংবা ব্যাগে বা জানালার পাশে রোদের উত্তাপে এর রং, গন্ধ ও টেক্সচার বদলে গেলে তা আর কাজ করে না। নষ্ট হয়ে যাওয়া সানস্ক্রিন উল্টো ত্বকের ক্ষতি করতে পারে।
সানস্ক্রিন দেওয়ার সাথে সাথেই ওপর থেকে ফাউন্ডেশন বা পাউডার ডলে লাগালে সুরক্ষার মূল স্তরটি (Protective Film) ভেঙে যায়। তাই সানস্ক্রিন লাগানোর পর কিছুক্ষণ অপেক্ষা করুন, ত্বকে সেট হতে দিন এবং তারপর মেকআপ শুরু করুন।
অনেকে ভাবেন সানস্ক্রিন তো আর মেকআপ নয়, তাই পানি বা ফেসওয়াশ দিয়ে ধুয়েই শুয়ে পড়েন। কিন্তু ওয়াটারপ্রুফ বা ভারী সানস্ক্রিন সাধারণ ফেসওয়াশে পুরোপুরি ওঠে না। রাতে মাইসেলার ওয়াটার বা অয়েল ক্লিনজার দিয়ে ‘ডাবল ক্লিনজিং’ না করলে বন্ধ লোমকূপ থেকে অ্যাকনে ও ব্ল্যাকহেডস তৈরি হতে পারে।
দিনশেষে, সানস্ক্রিন শুধু কোনো বিউটি প্রোডাক্ট নয়—এটি ত্বকের সুরক্ষার একটি স্বাস্থ্যকর অভ্যাস। ভালো মানের সানস্ক্রিন কিনলেন, কিন্তু ব্যবহারের ভুল থাকলে আসল সুরক্ষা কখনোই ত্বকে এসে পৌঁছাবে না। তাই নিয়ম মেনে এই যত্নটুকুই আপনার ত্বককে ক্ষতিকর রশ্মি থেকে মুক্ত রেখে শতভাগ সতেজ রাখবে।
হ্যাঁ, অবশ্যই। মেঘলা দিনেও সূর্যের ক্ষতিকর UV রশ্মির প্রায় ৮০% মেঘ ভেদ করে ত্বকে পৌঁছায়। তাই আবহাওয়া যেমনই হোক, বাইরে বের হলে সানস্ক্রিন ব্যবহার করা জরুরি।
এর অর্থ হলো ত্বকের প্রতি ১ বর্গসেন্টিমিটার জায়গায় প্রায় ২ মিলিগ্রাম সানস্ক্রিন লাগানো। ল্যাবে সানস্ক্রিনের SPF পরীক্ষা করার সময় এই আদর্শ পরিমাপটি ব্যবহার করা হয়।
হ্যাঁ। অতিরিক্ত ঘাম হলে, সাঁতার কাটলে বা তোয়ালে/টিস্যু দিয়ে মুখ মুছলে ২ ঘণ্টা অপেক্ষা না করে সাথে সাথেই আবার সানস্ক্রিন লাগিয়ে নেওয়া ভালো।
না, এটি ভুল ধারণা। SPF 30 প্রায় ৯৭% এবং SPF 50 প্রায় ৯৮% UVB রশ্মি ঠেকায়। মাত্র ১% সুরক্ষার পার্থক্য থাকায় SPF দ্বিগুণ হলেও সুরক্ষা দ্বিগুণ হয় না।
'Broad-spectrum' বলতে এমন সানস্ক্রিন বোঝায়, যা সূর্যের UVA (বয়সের ছাপ ফেলা রশ্মি) এবং UVB (ত্বক পুড়িয়ে দেওয়া রশ্মি)—এই দুই ধরনের ক্ষতিকর রশ্মি থেকেই ত্বককে বাঁচায়।
সাধারণ স্কিনকেয়ার রুটিনে ময়েশ্চারাইজার ব্যবহারের পরে সানস্ক্রিন লাগাতে হয়। এরপর মেকআপ করতে চাইলে সানস্ক্রিন শুকানোর পর মেকআপ করতে পারেন।
একদমই নয়। কোনো সানস্ক্রিনই ১০০% রশ্মি আটকাতে পারে না। তাই সানস্ক্রিনের পাশাপাশি ছাতা, টুপি, সানগ্লাস ও ঢিলেঢালা পোশাক ব্যবহার করা উচিত।
না, সানস্ক্রিন ত্বকের ক্যানসার তৈরি করে—এমন কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। বরং সূর্যের ক্ষতিকর UV রশ্মির প্রভাবেই ত্বকের ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ে, যা থেকে সানস্ক্রিন আমাদের রক্ষা করে।
না। ত্বকের রং ফর্সা, শ্যামলা বা গাঢ় যাই হোক না কেন, সবার জন্যই সানস্ক্রিন আবশ্যক। গাঢ় ত্বকে মেলানিন বেশি থাকলেও তা ক্ষতিকর UV রশ্মি থেকে সম্পূর্ণ সুরক্ষা দিতে পারে না।
হ্যাঁ। ব্রড-স্পেকট্রাম সানস্ক্রিন নিয়মিত ব্যবহারে রোদে ত্বক তামাটে হওয়া (Tanning), মেচেতা ও ডার্ক স্পট পড়া কমে যায়। ফলে ধীরে ধীরে ত্বকের স্বাভাবিক ও সমান রং ফিরে আসে।
না, এই সময়ে কেমিক্যাল সানস্ক্রিনের কিছু উপাদান রক্তে মিশে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। তাই গর্ভবতী ও স্তন্যদানকারী মায়েদের জন্য Mineral/Physical Sunscreen (যাতে Zinc oxide বা Titanium dioxide থাকে) ব্যবহার করা সবচেয়ে নিরাপদ।
তাত্ত্বিকভাবে সানস্ক্রিন UV রশ্মি ব্লক করে, তবে বাস্তবে নিয়মিত সঠিক নিয়মে সানস্ক্রিন মাখলেও শরীর প্রয়োজনীয় ভিটামিন ডি তৈরি করে নিতে পারে। তা ছাড়া শুধু সূর্যরশ্মির ওপর নির্ভর না করে খাদ্যাভ্যাসের মাধ্যমেই ভিটামিন ডি-এর ঘাটতি পূরণ করা স্বাস্থ্যকর।