মাইগ্রেন কী ও কেন হয়? লক্ষণ, কারণ এবং ব্যথামুক্ত জীবনের সহজ উপায়
August 2, 2026
August 2, 2026
আমাদের দেশের একটি বিশাল জনগোষ্ঠী নিশব্দে এই যন্ত্রণার সাথে লড়াই করে চলছেন। নিয়মিত মাথাব্যথায় ভুগলেও সেটি সাধারণ মাথাব্যথা নাকি মাইগ্রেন—তা বুঝতে পারেন না। ফলে কেউ ব্যথা সহ্য করেন, আবার কেউ চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই বারবার ব্যথানাশক ওষুধ খান। তবে হতাশ হওয়ার কিছু নেই; এটি কোনো নিরাময়হীন রহস্য নয়। সঠিক সচেতনতা ও চিকিৎসার মাধ্যমে এই ব্যথায় স্বস্তি আনা সম্ভব।
তাহলে মাইগ্রেন আসলে কী? আর সাধারণ মাথাব্যথা থেকে এটি কীভাবে আলাদা? বিষয়টি শুরুতেই পরিষ্কার করে নেওয়া যাক।
মাইগ্রেন শুধু সাধারণ মাথাব্যথা নয়। এটি মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্রের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি স্নায়বিক সমস্যা। এতে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে ব্যথা সাধারণত মাথার যেকোনো এক পাশে তীব্রভাবে শুরু হয়। মাইগ্রেনের ব্যথা কমপক্ষে ৪ ঘণ্টা স্থায়ী হয়, তবে এটি টানা ২ থেকে ৩ দিন (৭২ ঘণ্টা) পর্যন্তও গড়াতে পারে। বারবার ফিরে আসাই এর মূল বৈশিষ্ট্য। অনেকের ক্ষেত্রে এই সমস্যা বছরের পর বছর, এমনকি আজীবনও থেকে যেতে পারে।
মাইগ্রেনের ব্যথায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের অভিজ্ঞতা সব সময় এক রকম হয় না। লক্ষণ ও ব্যথার ধরণ অনুযায়ী চিকিৎসা বিজ্ঞানে মাইগ্রেনকে প্রধানত দুটি ভাগে ভাগ করা হয়:
অরা যুক্ত মাইগ্রেন (Migraine with aura / Classic Migraine)
মাথাব্যথা শুরু হওয়ার ঠিক আগে বা ব্যথার শুরুতেই কিছু বিশেষ শারীরিক সংকেত বা পূর্বলক্ষণ দেখা দেয় যাকে 'অরা' বলা হয়। প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মাইগ্রেন রোগীর ক্ষেত্রে এটি দেখা যায়। এ সময় চোখে হঠাৎ আলোর ঝলকানি বা জিগজ্যাগ রেখা দেখা দিতে পারে, চোখের সামনে তৈরি হতে পারে অন্ধকার বা অন্ধবিন্দু। কারও কারও মুখে বা হাতে পিন ফোটার মতো অনুভূতি হয় কিংবা অঙ্গ অবশ লাগে। এমনকি কথা বলতেও সমস্যা হতে পারে। সাধারণত এই অরা স্থায়ী হয় ৫ থেকে ৬০ মিনিট পর্যন্ত। এরপরই শুরু হয় মূল মাথাব্যথা।
অরা ছাড়া মাইগ্রেন (Migraine without aura / Common Migraine)
এটিই মাইগ্রেনের সবচেয়ে পরিচিত ধরন। আক্রান্তদের প্রায় ৭০ থেকে ৮০ শতাংশই এই দলে পড়েন। কোনো পূর্বলক্ষণ ছাড়াই একেবারে হঠাৎ করেই মাথার একপাশে শুরু হয় তীব্র দপদপে ব্যথা। ব্যথার পাশাপাশি বমি ভাব, বমি হওয়া এবং আলো ও শব্দের প্রতি চরম অতিষ্ঠতা তৈরি হয়।
মাইগ্রেনের লক্ষণ সবার ক্ষেত্রে এক রকম নয়। এটি মাথার একপাশে, কখনো কখনো দুই পাশেই তীব্র ব্যথা তৈরি করে। সাধারণত একটি পূর্ণাঙ্গ মাইগ্রেন অ্যাটাক চারটি ধাপে ঘটে থাকে:
মাথাব্যথা শুরু হওয়ার কয়েক ঘণ্টা থেকে এক-দুই দিন আগেই শরীর কিছু সংকেত দিতে পারে। এই ধাপকে বলা হয় প্রোড্রোম।
ঘন ঘন মেজাজ পরিবর্তন হওয়া (হঠাৎ বিষণ্ণতা বা অতিরিক্ত আনন্দ)
ঘাড় শক্ত হয়ে থাকা বা টান লাগা
বারবার হাই তোলা
প্রস্রাবের বেগ হওয়া
নির্দিষ্ট কোনো খাবার খাওয়ার তীব্র ইচ্ছা জাগা
কোষ্ঠকাঠিন্য ও শরীরে পানি জমে ফোলা ভাব তৈরি হওয়া
ব্যথা শুরুর ঠিক আগে বা ব্যথার শুরুর দিকে এটি ঘটতে পারে। এগুলো মূলত স্নায়ুতন্ত্রের সাময়িক কিছু সংকেত, যা ৫ থেকে ৬০ মিনিটের মতো স্থায়ী হয়ে নিজে থেকেই সেরে যায়।
যা সাধারণত ৫ থেকে ৬০ মিনিট স্থায়ী হয়ে নিজে থেকেই সেরে যায়।
চোখের সামনে আলোর বিন্দু, ঝলকানি বা অদ্ভুত আকৃতি দেখা
সাময়িকভাবে দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে যাওয়া বা অন্ধকার দেখা
হাত বা পায়ে সূঁচ ফোটানোর মতো ঝিঁঝিঁ ধরা অনুভূতি
মুখের একপাশ বা শরীরের কোনো এক দিক দুর্বল/অবশ হয়ে যাওয়া
কথা বলতে বা শব্দ উচ্চারণে সমস্যা হওয়া
কথা বলতে বা কোনো কিছুতে মনোযোগ দিতে সমস্যা হওয়া
চিকিৎসা না করালে এই মূল ব্যথার ধাপ ৪ থেকে ৭২ ঘণ্টা পর্যন্ত টিকে থাকতে পারে। এই ধাপে যা হয়:
মাথার একপাশে তীব্র ব্যথা (কখনও দুই পাশেই হতে পারে)
শারীরিক সামান্য নড়াচড়াতেই ব্যথার তীব্রতা বেড়ে যাওয়া
আলো, শব্দ এবং কড়া গন্ধের প্রতি চরম অস্বস্তি হওয়া
বমি বমি ভাব এবং বমি হওয়া
মাথাব্যথা কমে গেলেও শরীর সঙ্গে সঙ্গেই স্বাভাবিক হয় না। ব্যথার পর প্রায় একদিন পর্যন্ত এই অনুভূতির রেশ থেকে যায়, যাকে 'মাইগ্রেন হ্যাংওভার' বলা চলে:
প্রচণ্ড ক্লান্তি, শরীর নিংড়ানো দুর্বলতা ও মাথা ঝিমঝিম করা
মন দিয়ে কাজ করতে না পারা বা 'ব্রেন ফগ' অনুভূত হওয়া
মাথা ঝাঁকালে বা দ্রুত নাড়ালে সাময়িকভাবে আবার হালকা ব্যথা ফিরে আসা
আলো ও শব্দের প্রতি তখনও কিছুটা সংবেদনশীলতা থাকা
ব্যথার ধরণ: মাইগ্রেন এবং সাধারণ মাথাব্যথার (যেমন: টেনশন হেডেক) মধ্যে প্রধান তফাত হলো এদের ব্যথার ধরন ও স্থান। সাধারণ মাথাব্যথায় মাথার দুই পাশে, কপালে বা রগে একঘেয়ে চাপধরা বা ভারী অনুভূতি হয়; মনে হয় কপালজুড়ে শক্ত কিছু বেঁধে রাখা হয়েছে। অন্যদিকে, মাইগ্রেনের ব্যথা সাধারণত মাথার যেকোনো একপাশে হঠাৎ শুরু হয় এবং এর ধরনটি হয় তীব্র দপডপ বা স্পন্দনযুক্ত।
শারীরিক কর্মকাণ্ড: ব্যথার তীব্রতা এবং দৈনন্দিন কাজকর্মে এর প্রভাবও সম্পূর্ণ ভিন্ন। সাধারণ মাথাব্যথা মৃদু থেকে মাঝারি ধরনের হওয়ায় কিছুটা অস্বস্তি থাকলেও দৈনন্দিন কাজ চালিয়ে নেওয়া যায়। কিন্তু মাইগ্রেনের ব্যথা এতটাই তীব্র হয় যে স্বাভাবিক কাজকর্ম পুরোপুরি থমকে যায়। এমনকি হাঁটাচলা, সিঁড়ি ভাঙা বা মাথা নাড়ালে মাইগ্রেনের ব্যথা বহুগুণ বেড়ে যায়, যা সাধারণ মাথাব্যথার ক্ষেত্রে ঘটে না।
অন্যান্য লক্ষণ: আনুষঙ্গিক লক্ষণ এবং পূর্বলক্ষণের দিক থেকেও এদের সহজে আলাদা করা যায়। সাধারণ মাথাব্যথায় সাধারণত অন্য কোনো শারীরিক সমস্যা থাকে না। কিন্তু মাইগ্রেনের সময় তীব্র ব্যথার সাথে বমি ভাব, বমি হওয়া এবং আলো, শব্দ বা কড়া গন্ধের প্রতি চরম অতিষ্ঠতা তৈরি হয়।
চিকিৎসাবিজ্ঞানে মাইগ্রেনের সুনির্দিষ্ট একটিমাত্র কারণ এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে বিজ্ঞানীরা মনে করেন, বংশগত (জেনেটিক) গঠন এবং স্নায়ুতন্ত্রে ঘটে যাওয়া কিছু জটিল পরিবর্তনই এর মূল কারণ। সহজ ভাষায় মাইগ্রেন শুরু হওয়ার পেছনের প্রধান কারণগুলো নিচে দেওয়া হলো:
মাইগ্রেন প্রায়ই বংশপরম্পরায় ছড়ায়। পরিবারে বা রক্তের সম্পর্কযুক্ত কারও মাইগ্রেন থাকলে, নিজের এই সমস্যা হওয়ার ঝুঁকিও বহুলাংশে বেড়ে যায়।
আমাদের মাথার ভেতরের সমস্ত অনুভূতি (বিশেষ করে ব্যথা) বহন করে 'ট্রাইজেমিনাল নার্ভ' নামের একটি প্রধান স্নায়ু। এটি মস্তিষ্কের একদম নিচের অংশ বা 'ব্রেনস্টেম'-এর সাথে যুক্ত। কোনো কারণে যখন এই স্নায়ুগুলো অতিরিক্ত উত্তেজিত হয়ে পড়ে, তখন মস্তিষ্কের ভেতরের স্নায়ুকোষগুলোর মধ্যে যেন একটা 'বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিটের' মতো ঢেউ খেলে যায়। এই উত্তেজনার কারণে মস্তিষ্কের আবরণের রক্তনালীগুলো হঠাৎ ফুলে ওঠে বা প্রসারিত হয়, আর তখনই মাথার ভেতর দপদপ করে তীব্র ব্যথার সংকেত তৈরি হতে থাকে।
সেরোটোনিন ও এস্ট্রোজেন হরমোনের মাত্রা ওঠানামা করলে ব্যথার প্রতি স্নায়ুর সংবেদনশীলতা অনেকখানি বেড়ে যায়। সেরোটোনিনের পরিবর্তন নারী-পুরুষ উভয়ের ক্ষেত্রেই মাইগ্রেনকে উসকে দিতে পারে। আর এস্ট্রোজেন, যা মূলত নারীদের হরমোন—পিরিয়ডের সময়, বয়ঃসন্ধিতে বা জীবনের বিভিন্ন ধাপে ওঠানামা করে, যা নারীদের মধ্যে মাইগ্রেনের প্রবণতা বাড়িয়ে দিতে পারে।
মাইগ্রেনের প্রধান ট্রিগার: মানসিক চাপ বা স্ট্রেস
ঘুম ও শারীরিক ক্লান্তি
আবহাওয়া ও পরিবেশের পরিবর্তন
হরমোনের পরিবর্তন
ক্যাফেইন ও অ্যালকোহল
আবহাওয়ার পরিবর্তন
পানিশূন্যতা বা ডিহাইড্রেশন
তীব্র আলো
কড়া গন্ধ
অতিরিক্ত ব্যথানাশক ওষুধ সেবন
অনেকের মনেই ভুল ধারণা থাকে যে, একটি ইসিজি, রক্ত পরীক্ষা বা স্ক্যান করলেই বোধহয় মাইগ্রেন ধরা পড়বে। বাস্তবে কিন্তু বিষয়টি তেমন নয়। মাইগ্রেন নির্ণয় করার জন্য নির্দিষ্ট কোনো একক রক্ত পরীক্ষা বা ল্যাব টেস্ট নেই। মূলত আপনার বর্ণনা করা লক্ষণ, ব্যথার ধরন এবং শারীরিক পরীক্ষা পর্যালোচনা করেই চিকিৎসক মাইগ্রেন শনাক্ত করেন।
অন্যান্য পরীক্ষা-নিরীক্ষা
যদি আপনার লক্ষণগুলো একটু ভিন্ন বা অস্বাভাবিক হয়, অথবা শারীরিক পরীক্ষায় কোনো সমস্যা ধরা পড়ে, তবে অন্য কোনো বড় রোগ বা স্বাস্থ্যসমস্যা আছে কি না তা নিশ্চিত হওয়ার জন্য চিকিৎসক বিশেষ কিছু পরীক্ষা করতে দিতে পারেন:
লক্ষণ অস্বাভাবিক মনে হলে চিকিৎসক আরও কিছু পরীক্ষা দিতে পারেন:
রক্ত পরীক্ষা: অন্তর্নিহিত স্বাস্থ্যসমস্যা বা ইনফেকশন আছে কি না দেখতে
সাইনাস এক্স-রে: সাইনাসজনিত সমস্যা আছে কি না যাচাই করতে
এমআরআই: মস্তিষ্কের ভেতরের স্পষ্ট ছবি তৈরি করতে
সিটি স্ক্যান: মাথার ভেতরের গঠন বিস্তারিতভাবে দেখতে
স্পাইনাল ট্যাপ: মস্তিষ্কে ইনফেকশন আছে কি না যাচাই করতে
অনেকেরই ভুল ধারণা রয়েছে যে, মাইগ্রেন হলে ঘন ঘন সাধারণ পেইনকিলার খেলেই বুঝি সমস্যার সমাধান হয়ে গেল। কিন্তু বাস্তবতা হলো, অতিরিক্ত ওষুধ খেলে উল্টো ব্যথা আরও চেপে বসতে পারে। যদিও মাইগ্রেন পুরোপুরি স্থায়ীভাবে দূর করার কোনো যাদুকরী ওষুধ নেই, তবে সঠিক চিকিৎসা ও একটু সচেতনতায় এই ব্যথাকে চমৎকারভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।
ব্যথা শুরু হওয়ার ঠিক মুহূর্তেই সেটিকে থামিয়ে দেওয়া এবং যন্ত্রণার তীব্রতা কমানোর জন্য এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
মৃদু থেকে মাঝারি ব্যথায়: ব্যথার শুরুতেই ডাক্তারের পরামর্শে প্যারাসিটামল, ক্যাফেইন কম্বিনেশন কিংবা টোলফেনামিক অ্যাসিড বা নাপ্রোক্সেনের মতো ব্যথানাশক ওষুধ খাওয়া যেতে পারে।
তীব্র ব্যথায় (Triptans): যখন সাধারণ ওষুধে ব্যথা কমে না, তখন চিকিৎসকরা 'ট্রিপট্যান' (যেমন: সুমাট্রিপট্যান) জাতীয় ওষুধ প্রেসক্রাইব করে থাকেন। এটি মস্তিষ্কের ব্যথার সংকেতকে দ্রুত ব্লক করে দেয়।
বমি ভাব দূর করতে: ব্যথার সাথে বমি ভাব থাকলে বমি বন্ধের ওষুধ (যেমন: ডমপেরিডন) ব্যবহার করা হয়।
যাদের মাসে একাধিকবার বা টানা কয়েকদিন ধরে তীব্র মাইগ্রেনের আক্রমণ হয়, তাদের জন্য এই চিকিৎসা অত্যন্ত জরুরি।
নিয়মিত প্রতিরোধমূলক ওষুধ: ফ্লুনারিজিন (Flunarizine), প্রপ্রানোলল (Propranolol) বা টপিরেমেট (Topiramate)-এর মতো ওষুধগুলো ৩ থেকে ৬ মাস প্রতিদিন নিয়ম করে খেতে হয়। এগুলো ভবিষ্যতে মাইগ্রেনের আক্রমণের মাত্রা ও সময় কমিয়ে আনে।
আধুনিক ইনজেকশন থেরাপি: দীর্ঘমেয়াদী বা ক্রনিক মাইগ্রেনের রোগীদের জন্য বর্তমানে বোটক্স (Botox) এবং সিজিআরপি (CGRP) ইনজেকশনের মতো আধুনিক চিকিৎসাও দারুণ ভূমিকা রাখছে।
জরুরি সতর্কতা: নিজের মনমতো কখনোই বছরের পর বছর অতিরিক্ত ব্যথানাশক ওষুধ খাবেন না। এতে মেডিকেশন ওভারইউজ হেডেক (MOH) তৈরি হয়ে ব্যথা আরও স্থায়ী হয়ে যেতে পারে। তাই ওষুধ সেবনের আগে অবশ্যই একজন অভিজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
দৈনন্দিন জীবনের কিছু অভ্যাস মাইগ্রেনের আক্রমণ কমাতে জাদুর মতো কাজ করে। চিকিৎসকদের মতে, কেবল ওষুধের ওপর ভরসা না করে জীবনযাত্রায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনলে মাইগ্রেনের ব্যথা ও আক্রমণের সংখ্যা বহুলাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব।
নির্দিষ্ট সময় মানা: প্রতিদিন (এমনকি ছুটির দিনেও) একই সময়ে ঘুমাতে যান এবং একই সময়ে উঠুন। কম ঘুম যেমন মাইগ্রেন বাড়ায়, তেমনি অতিরিক্ত ঘুমালেও ব্যথা শুরু হতে পারে। রাতে ঘুম না হওয়ার কারণ ও প্রতিকার
বিছানায় ডিভাইসমুক্ত থাকা: ঘুমানোর অন্তত আধঘণ্টা আগে ফোন, ল্যাপটপ বা টিভি ব্যবহার বন্ধ করুন। শোবার ঘর অন্ধকার ও শান্ত রাখুন।
খাবার বাদ না দেওয়া: কোনো বেলার খাবার (বিশেষ করে সকালের নাস্তা) কখনো বাদ দেবেন না। খালি পেটে থাকলে রক্তে শর্করা বা গ্লুকোজ কমে যায়, যা দ্রুত ব্যথার কারণ হয়।
পর্যাপ্ত পানি পান: সারাদিনে অন্তত ২ থেকে ৩ লিটার পানি পান করুন। পানিশূন্যতা বা ডিহাইড্রেশন মাইগ্রেনের অন্যতম বড় ট্রিগার।
ট্রিগার খাবার এড়িয়ে চলা: অতিরিক্ত চকলেট, প্রক্রিয়াজাত মাংস, পুরোনো পনির, কৃত্রিম চিনি ও টেস্টিং সল্টযুক্ত (MSG) খাবার অনেক সময় ব্যথা বাড়ায়। আপনার কোন খাবারে সমস্যা হয়, তা খেয়াল রেখে এড়িয়ে চলুন।
২০-২০-২০ নিয়ম: কম্পিউটার বা মোবাইলে কাজ করার সময় প্রতি ২০ মিনিট পর পর ২০ ফুট দূরের কোনো বস্তুর দিকে অন্তত ২০ সেকেন্ড তাকিয়ে থাকুন।
রোদে সানগ্লাস ও ছাতা: প্রখর রোদে বের হলে অবশ্যই সানগ্লাস, ক্যাপ বা ছাতা ব্যবহার করুন।
ডিভাইসের স্ক্রিন সেটিং: ফোন বা কম্পিউটারে 'নাইট মোড' (Night Mode) বা 'আই কমফোর্ট' অন রাখুন এবং স্ক্রিনের কড়া আলো কমিয়ে রাখুন।
চা-কফিতে ভারসাম্য: দিনে ১-২ কাপের বেশি চা বা কফি না খাওয়াই ভালো। মাত্রাতিরিক্ত ক্যাফেইন যেমন ক্ষতি করে, তেমনি হঠাৎ ক্যাফেইন একবারে বন্ধ করে দিলেও রিবাউন্ড হেডেক বা মাথাব্যথ হতে পারে।
কড়া গন্ধ এড়ানো: কড়া পারফিউম, এয়ার ফ্রেশনার বা কেমিক্যালের তীব্র গন্ধ থেকে দূরে থাকুন।
হালকা ব্যায়াম: দিনে অন্তত ২০-৩০ মিনিট হালকা হাঁটা, ইয়োগা বা সাঁতার কাটার অভ্যাস করুন। এতে শরীরে 'এন্ডোরফিন' নামক হরমোন নিঃসৃত হয়, যা প্রাকৃতিক ব্যথানাশক হিসেবে কাজ করে। (তবে মাইগ্রেন ব্যথা চলাকালীন ভারী ব্যায়াম করবেন না)।
গভীর শ্বাসের অভ্যাস (Deep Breathing): প্রতিদিন অন্তত ১০ মিনিট শান্ত হয়ে বসে দীর্ঘ শ্বাস নিন ও ছাড়ুন। এটি স্নায়ুতন্ত্রকে শান্ত রাখে এবং মানসিক চাপ কমায়।
মাইগ্রেন নিঃসন্দেহে একটি অত্যন্ত কষ্টদায়ক শারীরিক অনুভূতি, তবে একে ভয় পেয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। সঠিক পরিকল্পনা ও সচেতনতা থাকলে মাইগ্রেনকে সাথে নিয়েই খুব সুন্দর ও স্বাভাবিক জীবনযাপন সম্ভব।
উত্তর: না, মাইগ্রেন পুরোপুরি নির্মূল বা স্থায়ীভাবে নিরাময় করা যায় না। তবে সঠিক চিকিৎসা, ওষুধের নিয়ম মানা এবং জীবনযাত্রার পরিবর্তনের মাধ্যমে এর আক্রমণ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।
উত্তর: সাধারণ মাথাব্যথায় মাথার দুই পাশে বা কপালে একঘেয়ে চাপধরা অনুভূতি হয়। কিন্তু মাইগ্রেনের ব্যথা সাধারণত মাথার যেকোনো একপাশে তীব্র দপদপ করে এবং এর সাথে বমি ভাব ও আলো-শব্দে চরম অস্বস্তি থাকে।
উত্তর: অতিরিক্ত চকলেট, প্রসেসড বা প্রক্রিয়াজাত মাংস, পুরোনো পনির, কৃত্রিম চিনি, টেস্টিং সল্ট (MSG), অতিরিক্ত চা-কফি এবং অ্যালকোহল মাইগ্রেনের ব্যথা বাড়িয়ে দিতে পারে।
উত্তর: হ্যাঁ, মাইগ্রেন অনেকটাই বংশগত। পরিবারে বা রক্তের সম্পর্কের আত্মীয়দের (যেমন: মা-বাবা) মাইগ্রেন থাকলে সন্তান বা পরবর্তী প্রজন্মের এটি হওয়ার ঝুঁকি বহুলাংশে বেড়ে যায়।
উত্তর: নারীদের শরীরে 'এস্ট্রোজেন' নামক হরমোনের ঘন ঘন ওঠানামার কারণে। বিশেষ করে পিরিয়ডের সময়, গর্ভধারণে বা বয়ঃসন্ধিতে এস্ট্রোজেনের মাত্রা কমলে নারীদের মাইগ্রেন অ্যাটাক বেশি হয়।
উত্তর: মূল মাথাব্যথা শুরু হওয়ার ঠিক আগে (৫-৬০ মিনিট স্থায়ী) চোখে আলোর ঝলকানি দেখা, জিগজ্যাগ রেখা দেখা, চোখের সামনে অন্ধকার লাগা বা হাত-পা ঝিঁঝিঁ ধরার মতো স্নায়বিক অনুভূতিকে 'অরা' বলে।
উত্তর: হ্যাঁ, দীর্ঘক্ষণ না খেয়ে থাকলে বা খাবার বাদ দিলে (বিশেষ করে সকালের নাস্তা) রক্তে শর্করা বা গ্লুকোজের মাত্রা কমে যায়, যা মস্তিষ্কের স্নায়ুকে উত্তেজিত করে মাইগ্রেনের ব্যথা শুরু করে।
উত্তর: একদমই না! চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ঘন ঘন পেইনকিলার খেলে 'মেডিকেশন ওভারইউজ হেডেক' (MOH) বা রিবাউন্ড হেডেক তৈরি হয়, যা মাথাব্যথাকে আরও স্থায়ী ও জটিল করে তোলে।
উত্তর: পরিমিত ক্যাফেইন (দিনে ১-২ কাপ চা/কফি) অনেক সময় মাইগ্রেনের প্রাথমিক ব্যথা কমাতে সাহায্য করে। তবে অতিরিক্ত চা-কফি খাওয়া বা হঠাৎ প্রতিদিনের কফি খাওয়া বন্ধ করে দিলে মাইগ্রেন হতে পারে।
উত্তর: স্ক্রিনের অতিরিক্ত নীল আলো (Blue Light) এবং চোখের ক্লান্তি মাইগ্রেনের অন্যতম বড় ট্রিগার। তাই দীর্ঘক্ষণ কাজের মাঝে চোখের বিশ্রাম দেওয়া এবং 'নাইট মোড' ব্যবহার করা উচিত।
উত্তর: হ্যাঁ, ঘুমের রুটিন সামান্য এদিক-ওদিক হলেই মাইগ্রেন হতে পারে। কম ঘুম যেমন ক্ষতিকর, ছুটির দিনে বেলা করে ঘুমোনো বা অতিরিক্ত ঘুমালেও অনেকের মাইগ্রেন শুরু হয়।
উত্তর: হ্যাঁ, সঠিক সময়ে ওষুধ না নিলে বা চিকিৎসা না করালে একটি মাইগ্রেন অ্যাটাক টানা ৪ ঘণ্টা থেকে শুরু করে ৭২ ঘণ্টা (৩ দিন) পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে।
উত্তর: হ্যাঁ, প্রচণ্ড রোদ, অতিরিক্ত গরম, বাতাসের আর্দ্রতা বা হঠাৎ করে আবহাওয়া ও তাপমাত্রা পরিবর্তন হলে সংবেদনশীল স্নায়ুর ওপর প্রভাব পড়ে মাইগ্রেন শুরু হতে পারে।
উত্তর: সাধারণ মাইগ্রেন থেকে ব্রেন টিউমার হয় না। তবে 'অরা-যুক্ত মাইগ্রেন' রোগীদের ক্ষেত্রে স্ট্রোকের ঝুঁকি সামান্য বেশি থাকে, তাই রক্তচাপ ও জীবনযাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখা জরুরি।
উত্তর: ব্যথা শুরু হওয়া মাত্রই আলো ও শব্দহীন একটি শান্ত-অন্ধকার ঘরে গিয়ে ঘুমানোর চেষ্টা করুন, কপালে বা ঘাড়ে ঠাণ্ডা বরফের সেঁক দিন এবং প্রচুর পানি পান করুন।