ব্রণ দূর করার উপায়ঃ ধরন, কারণ ও কি ব্যবহার করবেন
July 29, 2026
July 29, 2026
মুখে ব্রণ উঠলেই আমরা দ্রুত সমাধান খুঁজি। কেউ হুট করে টুথপেস্ট লাগিয়ে বসেন, কেউ মুখে ঘষেন লেবুর রস , আবার কেউ অস্থির হয়ে একসঙ্গে কয়েক ধরনের ফেসওয়াশ, সিরাম ও ক্রিম ব্যবহার শুরু করেন। কিন্তু ব্রণ দ্রুত কমাতে গিয়ে আপনি অজান্তেই নিজের ত্বকের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি করছেন না তো?
মনে রাখা জরুরি—সব ব্রণ কিন্তু এক রকম নয়। কারও মুখে ছোট ছোট ব্ল্যাকহেডস বা হোয়াইটহেডস, আবার কারও ক্ষেত্রে ব্রণগুলো লালচে ও বেশ ব্যথাযুক্ত। তাই ভুলভাল এক্সপেরিমেন্ট বন্ধ করে ব্রণ কমানোর প্রথম ও প্রধান ধাপই হলো—আপনার ব্রণটি ঠিক কোন ধরনের, তা সঠিকভাবে শনাক্ত করা।
ব্রণ নিয়ে যেকোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে চলুন জেনে নেওয়া যাক, আপনার ব্রণটি আসলে কোন ধরনের। চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে সহজভাবে বুঝতে গেলে, ব্রণকে মূলত দুটি বড় ভাগে ভাগ করা যায়।
কপাল, নাক বা থুতনিতে ছোট ছোট দানার মতো ব্রণ দেখা যাচ্ছে, কিন্তু সেগুলো লাল নয় আবার ফুলেও নেই। তাহলে সেটি কমেডোনাল অ্যাকনে। এ ধরনের ব্রণ ব্যথা তৈরি না করলেও ত্বকের মসৃণতা নষ্ট করে টেক্সচার খারাপ করে দেয়। অতিরিক্ত তেল (Sebum) এবং মৃত কোষ জমে লোমকূপ বন্ধ হয়ে গেলে এই ধরনের ব্রণ তৈরি হয়। মুখের টি-জোন (কপাল, নাক ও থুতনি) বেশি তেলতেলে হওয়ায় সেখানে এটি বেশি দেখা যায়; তবে শরীরের অন্যান্য অংশেও হতে পারে।
কমেডোনাল অ্যাকনে প্রধানত দুই ধরনের—
অনেকেই হয়তো ক্লোজড কমেডোন নামটি শুনেছেন। সহজভাবে বললে, হোয়াইটহেডসই (whiteheads) হলো ক্লোজড কমেডোন। । আমাদের ত্বকে প্রতিনিয়ত পুরোনো কোষ ঝরে নতুন কোষ তৈরি হয়। কিন্তু কখনো কখনো মরা কোষগুলো লোমকূপের ভেতরে আটকে যায় এবং ত্বকের অতিরিক্ত তেলের সাথে মিশে লোমকূপকে পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়। এর ফলেই ত্বকের ওপর ছোট, সাদাটে বা ত্বকের রঙের দানার মতো হোয়াইটহেডস দেখা দেয়।
ওপেন কমেডোনকে আমরা সাধারণত ব্ল্যাকহেডস (Blackheads) নামে চিনি। আমাদের ত্বকের লোমকূপের ভেতরে অতিরিক্ত তেল ও মরা কোষ জমে যখন আটকে যায়, তখনই ব্ল্যাকহেডসের জন্ম হয়। হোয়াইটহেডসের সাথে এর মূল পার্থক্যটা হলো—ব্ল্যাকহেডসে লোমকূপের মুখটি খোলা থাকে। লোমকূপের মুখে জমে থাকা তেল ও মরা কোষ যখন বাতাসের অক্সিজেনের সংস্পর্শে আসে, তখন তা জারিত (Oxidized) হয়ে কালো রং ধারণ করে।
ব্ল্যাকহেডস দেখলেই অনেকে টুলস দিয়ে নিজেই তুলে ফেলতে চান। কেউ হাত দিয়ে চাপ দেন, কেউ পিল-অফ মাস্ক ব্যবহার করেন। আবার কেউ বাড়িতে থাকা এক্সট্রাকশন টুল দিয়ে রোমকূপের ভেতরের অংশ বের করার চেষ্টা করেন। কিন্তু ভুলভাবে এসব করলে ত্বকে ছোট ক্ষত তৈরি হতে পারে। হতে পারে জ্বালা ও প্রদাহ। তাই ব্ল্যাকহেডস বা হোয়াইটহেডস দেখলেই জোর করে তুলে ফেলার বদলে লোমকূপ পরিষ্কার রাখা এবং নতুন কমেডোন যাতে না হয় সেদিকে নজর দেওয়া ভালো। এর জন্য স্কিনকেয়ার রুটিনে কিছু নির্দিষ্ট উপাদান সহায়ক হতে পারে।
অ্যাজেলাইক অ্যাসিড (Azelaic Acid)
স্যালিসাইলিক অ্যাসিড (Salicylic Acid / BHA)
অ্যাডাপালিন (Adapalene)
সালফার (Sulfur)
একটি মৃদু, non-comedogenic (যা পোরস ব্লক করে না) লিখা আছে এমন ক্লিনজার বা ফেসওয়াশ বেছে নিন। যা ত্বকের অতিরিক্ত তেল ও ময়লা পরিষ্কার করবে, কিন্তু মুখ ধোয়ার পর ত্বককে অতিরিক্ত শুষ্ক বা টানটান করে ফেলবে না। স্যালিসাইলিক অ্যাসিডযুক্ত ক্লিনজার কমেডোনাল অ্যাকনেতে দারুণ কাজ করে।
যেমন: CeraVe SA Smoothing Cleanser, COSRX Salicylic Acid Daily Gentle Cleanser, কিংবা Neutrogena Clear & Defend 2% Salicylic Acid Face Wash কমেডোনাল অ্যাকনেতে ভালো কাজ করে।
ব্রণ কমানোর জন্য বাজারে নানা ধরনের সিরাম ও অ্যাকটিভ উপাদান পাওয়া যায়। কিন্তু সব উপাদান সবার ত্বক বা সব ধরনের ব্রণের জন্য উপযোগী নয়। সব অ্যাক্টিভ একসঙ্গে ব্যবহার না করে ত্বকের সহ্যক্ষমতা অনুযায়ী বেছে নিন:
লোমকুপে জমে থাকা অতিরিক্ত তেল ও মৃত কোষ দূর করে স্যালিসাইলিক অ্যাসিড । ব্ল্যাকহেডস ও হোয়াইটহেডসের মতো কমেডোনাল অ্যাকনে কমাতে এই উপাদানটি বেশ কার্যকর। তাই স্যালিসাইলিক অ্যাসিডযুক্ত ক্লিনজার অথবা লিভ-অন সিরামের যেকোনো একটি দিয়ে শুরু করতে পারেন। তবে একই রুটিনে দুটো একসঙ্গে ব্যবহার না করাই ভালো। ক্লিনজার বা সিরাম হিসেবে দিনে বা রাতে সপ্তাহে ২-৩ দিন ব্যবহার উপযোগী।
এটি ত্বককে হালকা এক্সফোলিয়েট করে, লোমকূপ পরিষ্কার রাখে এবং নতুন কোমেডন তৈরি হতে বাধা দেয়। ব্রণ ও ব্রণের পরের কালচে দাগের ক্ষেত্রে সহায়ক হিসেবেও কাজ করে।
প্রোডাক্ট পরামর্শ: The Ordinary Azelaic Acid Suspension 10%, Anua Azelaic Acid 10 Hyaluron Redness Soothing Serum
কমেডোনাল অ্যাকনের জন্য বহুল ব্যবহৃত একটি টপিক্যাল রেটিনয়েড হলো অ্যাডাপালিন। ক্লিনিক্যাল ডার্মাটোলজিতেও এটি বেশ পরিচিত ট্রিটমেন্ট। । লোমকূপ বন্ধ হওয়া কমাতে এবং নতুন ব্রণ তেরি হওয়া হ্রাস করে । এটি রাতে ব্যবহার উপযোগী। মনে রাখবেন অ্যাডাপালিন এবংস্যালিসাইলিক অ্যাসিড লিভ-অন সিরাম একই রাতে একসাথে ব্যবহার করবেন না।
প্রথম 2 সপ্তাহ: সপ্তাহে ২ রাত
পরের 2 সপ্তাহ: সপ্তাহে ২-৩ রাত
সহ্য হলে: প্রতি রাতে
প্রোডাক্ট পরামর্শ: Differin Gel, Aclene Plus Gel, Fona Cream।
সালফার মৃত কোষ ঝরাতে সাহায্য করে। তারসাথে ত্বকের অতিরিক্ত তেল শোষণ করতেও বেশ কার্যকরী। কমেডোনাল অ্যাকন কমাতে সালফারযুক্ত ক্রিম, সাবান বা লোশন ব্যবহার করতে পারে। এটি রাতের বেলা ব্যবহার উপযোগী।
প্রোডাক্ট পরামর্শ: De La Cruz Sulfur Ointment (10%), The Ordinary Sulfur 10% Powder-to-Cream।
ব্রণপ্রবণ ত্বকের যত্নে ত্বকের আর্দ্রতা ধরে রাখা এবং সূর্যের ক্ষতিকর রশ্মি থেকে ত্বককে সুরক্ষিত রাখাও জরুরি। তাই প্রতিদিনের স্কিনকেয়ার রুটিনে ময়েশ্চারাইজার ও সানস্ক্রিন—দুটিরই কোনো বিকল্প নেই।
ওয়েল ফ্রি ও লাইটওয়েট ময়শ্চারাইজার ব্যবহার করুন। হালকা জেল বা লোশন ফর্মুলা বেছে নিন। ত্বক তৈলাক্ত হলেও ময়শ্চারাইজার বাদ দেওয়া যাবে না। তারসাথে সানস্ক্রিন ব্যবহার আবশ্যক, নতুবা সূর্যের রোদে ব্রণের দাগ আরও গাঢ় হয়ে যেতে পারে। Top 10 Best Sunscreen in Bangladesh 2026
গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতাঃ নতুন যেকোনো প্রোডাক্ট ব্যবহারের আগে কান বা চোয়ালের পাশে প্যাচ টেস্ট করে নিন। গর্ভবতী, স্তন্যদানকারী বা গর্ভধারণের পরিকল্পনা করছেন—এমন কেউ চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া Adapalene বা অন্য কোনো Retinoid ব্যবহার করবেন না।
এবার আসা যাক এমন ব্রণের কথায়, যেটা শুধু দেখতে খারাপ নয় সাথে ব্যথাও দেয়। Inflammatory Acne বা প্রদাহযুক্ত ব্রণ হলো এমন এক ধরনের ব্রণ, যেখানে ত্বক লাল, ফুলে যায় এবং স্পর্শ করলে ব্যথা অনুভূত হয়। ব্ল্যাকহেডস বা হোয়াইটহেডসের তুলনায় এগুলো বেশি গুরুতর।
নিচে ৪ রকমের প্রদাহযুক্ত ব্রণের মূল ধরণগুলো এবং এর পেছনের মূল কারণ সহজভাবে তুলে ধরা হলো -
ত্বকের ওপর তৈরি হওয়া ছোট ও শক্ত গুটির মতো ব্রণ। এই ব্রণগুলো দেখতে লাল ও ফোলা হলেও এদের মাথায় কোনো সাদা বা হলুদ পুঁজ দেখা যায় না। তবে এগুলোতে হাত লাগলে বা আলতো স্পর্শ করলেও ব্যথা লাগে । এটাই হলো প্যাপুলস। মুখ (বিশেষ করে কপাল, নাক ও থুতনি) ছাড়াও ঘাড়, বুক, পিঠ ও কাঁধে হতে পারে।
ত্বকের অতিরিক্ত তেল এবং মরা চামড়া একসাথে মিলে যখন লোমকূপের মুখ বন্ধ করে দেয়, তখন ভেতরে ব্যাকটেরিয়ার বংশবৃদ্ধি ঘটে। এর ফলেই প্যাপুলসের সৃষ্টি হয়। এ ছাড়া নতুন কোনো সাবান, ক্রিম বা মেকআপের ক্ষতিকর রাসায়নিক রিয়্যাক্ট করলেও প্যাপুলস হতে পারে।। আবার ত্বকে প্রোটিন জমে রোমকূপ আটকে গেলেও প্যাপুলসের উপদ্রব দেখা দেয়।
পাস্টুলস হলো এমন ব্রণ যার মাঝখানে সাদা বা হলুদ রঙের স্পষ্ট পুঁজভরা একটি কেন্দ্র বা মাথা থাকে। চারপাশের ত্বকটা লালচে হয়ে ফুলে থাকে। স্পর্শ করলে বেশ ব্যথা লাগে। সাধারণত মুখ, বুক ও পিঠে বেশি দেখা যায়। একই জায়গায় একসঙ্গে অনেকগুলো পাস্টুলসও তৈরি হতে পারে। হাত দিয়ে টিপে পুঁজ বের করে দিলে সাময়িক আরাম লাগলেও, এতে ব্যাকটেরিয়া ত্বকের আরও গভীরে চলে যায় এবং স্থায়ী গর্ত বা কালচে দাগ তৈরি করে।
ত্বকে অতিরিক্ত তেল ও মরা কোষ জমে রোমকূপ বন্ধ হয়ে যায়। পরবর্তীতে সেই বন্ধ লোমকূপে Cutibacterium acnes ব্যাকটেরিয়া বংশবৃদ্ধি করে। এই ব্যাকটেরিয়ার আক্রমণ ঠেকাতে আমাদের শরীরের ইমিউন সিস্টেম সাথে সাথে শ্বেত রক্তকণিকা পাঠায়। ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে সেই শ্বেত রক্তকণিকার লড়াইয়ের ফলে জমে থাকা মৃত কোষ ও তরলের সমন্বয়ে দৃশ্যমান এই সাদা বা হলুদ পুঁজ (Pus) তৈরি হয়।
ব্যথাদায়ক লাল গুটি (প্যাপুলস) কিংবা পুঁজে ভরা ব্রণ (পাস্টুলস)—যেটাই হোক না কেন, এগুলো দেখে অস্থির হয়ে ভুলভাল প্রোডাক্ট ব্যবহার করলে হিতে বিপরীত হতে পারে। প্রদাহযুক্ত এ ব্যথাদায়ক এসব ব্রণ দূর করতে সঠিক উপাদান নির্বাচন ও কিছুটা ধৈর্য প্রয়োজন। চলুন জেনে নেওয়া যাক, কীভাবে প্যাপুলস ও পাস্টুলস থেকে মুক্তি পাবেন:
বেনজয়েল পারঅক্সাইড (Benzoyl Peroxide / BPO)
অ্যাডাপালিন (Adapalene 0.1%)
স্যালিসাইলিক অ্যাসিড (Salicylic Acid / BHA
অ্যাজেলাইক অ্যাসিড (Azelaic Acid)
এই ধরনের ব্রণের জন্য সুগন্ধিমুক্ত ও মৃদু ফেসওয়াশ ব্যবহার করুন। যা ত্বককে অতিরিক্ত শুষ্ক বা জ্বালাপোড়া না করে পরিষ্কার করবে। ফেসওয়াশ দিয়ে মুখ ধোয়ার সময় কখনোই শক্ত করে স্ক্রাব বা জোরে ঘষাঘষি করবেন না। এতে পুঁজে ভরা পাস্টুলস ফেটে গিয়ে ত্বকের অন্য জায়গায় ইনফেকশন ছড়িয়ে পড়তে পারে।
প্রোডাক্ট পরামর্শ: CeraVe Acne Foaming Cream Cleanser (4% BPO), La Roche-Posay Effaclar Duo Dual Action Acne Cleanser, অথবা COSRX Salicylic Acid Cleanser।
Benzoyl Peroxide Gel (2.5% - 5%)
প্যাপুলস ও পাস্টুলসের চিকিৎসায় ডার্মাটোলজিস্টদের প্রথম পছন্দ। এটি দ্রুত পুঁজ শুকায় ও টনটনে ব্যথা কমায়। সংবেদনশীল ত্বক হলে BPO ফেসওয়াশ ব্যবহার করতে পারেন, আর বেশি কার্যকারিতার জন্য লিভ-অন জেল বা ক্রিম ভালো। সংবেদনশীল ত্বক হলে BPO ফেসওয়াশ ব্যবহার করতে পারেন, আর বেশি কার্যকারিতার জন্য লিভ-অন জেল বা ক্রিম ভালো।
প্রোডাক্ট পরামর্শ: Galderma Benzac AC Gel, Oxigel Topical Gel।
প্রদাহযুক্ত ব্রণের চিকিৎসায় সহায়ক একটি উপাদান। এটি ব্রণের সঙ্গে যুক্ত Cutibacterium acnes ব্যাকটেরিয়ার পরিমাণ কমায়। সাথে ত্বকের প্রদাহ ও লালচেভাব কমায়।
প্রোডাক্ট পরামর্শ: The Ordinary Azelaic Acid Suspension 10%, Anua Azelaic Acid 10 Serum
Retinoids বা Vitamin A-এর ডেরিভেটিভ ব্রণের চিকিৎসায় বহুল ব্যবহৃত একটি উপাদান। এগুলো রোমকূপ বন্ধ হয়ে যাওয়া কমাতে এবং নতুন ব্রণ তৈরি হওয়া প্রতিরোধে সাহায্য করতে পারে। ফলে প্যাপুলসের মতো ব্রণ কমাতেও এটি উপকারী হতে পারে।
ব্যবহারের নিয়ম:
ম ও ২য় সপ্তাহ: সপ্তাহে ২ রাত।
৩য় ও ৪র্থ সপ্তাহ: সপ্তাহে ৩ রাত।
ত্বক মানিয়ে নিলে: একরাত পর পর বা প্রতি রাতে।
প্রোডাক্ট পরামর্শ: Differin Adapalene 0.1% Gel, Aclene Plus Gel, Derma-V Gel 0.1%, অথবা The Ordinary Granactive Retinoid 2% in Squalane।
বেনজয়েল পারঅক্সাইড কিংবা রেটিনয়েডের মতো শক্তিশালী অ্যাক্টিভ উপাদান ব্যবহারের অন্যতম প্রধান পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হলো—এটি ত্বককে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশ শুষ্ক, খসখসে ও টানটান করে তোলে। তাই সিরামাইড, হায়ালুরোনিক অ্যাসি্ড, প্যানথেনল আছে এমন ময়শ্চারাইজার বাছাই করুন। অ্যাক্টিভ উপাদান ব্যবহার করলে ত্বক সূর্যের আলোয় সংবেদনশীল হয়ে পড়ে, তাই সকালে সানস্ক্রিন লাগানোও বাধ্যতামূলক।
গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা: গর্ভবতী, স্তন্যদানকারী বা গর্ভধারণের পরিকল্পনা করছেন এমন কেউ চিকিৎসকের সরাসরি পরামর্শ ছাড়া Adapalene বা অন্য যেকোনো Retinoid টাইপ উপাদান ব্যবহার করবেন না।
নডিউলার অ্যাকনে হলো গুরুতর ধরনের ইনফ্ল্যামেটরি অ্যাকনে। এতে ত্বকের গভীরে শক্ত ও বড় ব্রণ তৈরি হয়। এটি প্রথমে ত্বকের গভীরে শুরু হয়ে পরে ওপরের দিকে লাল, ফোলা ও ব্যথাদায়ক ব্রণ হিসেবে দেখা দেয়।
নডিউলার অ্যাকনের সাধারণ বৈশিষ্ট্যগুলো হলো—
ত্বকের নিচে শক্ত ও ফোলা গুটি
স্পর্শ করলে ব্যথা
দৃশ্যমান সাদা বা পুঁজভরা মাথা থাকে না
কয়েক সপ্তাহ বা কখনও কয়েক মাস পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে
সেরে যাওয়ার পর স্থায়ী অ্যাকনে স্কার হওয়ার ঝুঁকি থাকে
নডিউলার অ্যাকনে কেন হয়?
অন্যান্য ব্রণের মতো এটিও শুরু হয় লোমকূপ আটকে যাওয়ার মাধ্যমে। ত্বকের অতিরিক্ত তেল ও মরা ত্বককোষ একসঙ্গে মিলে লোমকূপ বন্ধ করে দেয়। এরপর সেখানে Cutibacterium acnes (C. acnes) ব্যাকটেরিয়ার বংশবৃদ্ধি ঘটে। ব্যাকটেরিয়া ঠেকাতে শরীরের ইমিউন সিস্টেম যখন লড়াই শুরু করে, তখন যে তীব্র প্রদাহটি তৈরি হয় তা ত্বকের অনেক গভীরে চলে যায়। এই কারণেই নডিউল সাধারণ পিম্পলের মতো সহজে পেকে বাইরে আসে না এবং এর মাথায় কোনো পুঁজ দেখা যায় না।
ইনফ্ল্যামেটরি অ্যাকনের সবচেয়ে গুরুতর ও জটিল রূপ হলো সিস্টিক অ্যাকনে। এতে ত্বকের গভীরে তরল বা পুঁজভরা, বড় এবং প্রচণ্ড ব্যথাদায়ক সিস্ট (Cyst) তৈরি হয়। সাধারণ ব্রণের তুলনায় এটি অনেক বেশি সংবেদনশীল এবং এতে স্থায়ী গর্ত ও দাগ পড়ার ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি থাকে।
অতিরিক্ত তেল ও মরা কোষ জমে গঠিত ব্লকেজটি যখন ত্বকের একদম গভীরে চলে যায়, তখন সেখানে বড় ও ব্যথাযুক্ত সিস্ট তৈরি হয়। অ্যান্ড্রোজেন হরমোন বাড়লে ত্বকে্র তেলগ্রন্থি মাত্রাতিরিক্ত তেল তৈরি করে। নারীদের ক্ষেত্রে চোয়াল ও থুতনির আশপাশে বারবার এমন গভীর ব্রণ হওয়া এবং মাসিকের আগে তা বেড়ে যাওয়া হরমোনাল প্রভাবের স্পষ্ট ইঙ্গিত। পরিবারে বা বাবা-মায়ের গুরুতর ব্রণের ইতিহাস থাকলে সিস্টিক অ্যাকনে হওয়ার প্রবণতা বেশি থাকে। সাথে খাদ্যাভ্যাস, মানসিক চাপ ও পরিবেশগত প্রভাবও যুক্ত হতে পারে।
Adapalene / Tretinoin: লোমকূপ বন্ধ হওয়া কমাতে এবং নতুন গভীর ব্রণ তৈরি হওয়া রোধ করতে কাজ করে।
Benzoyl Peroxide (BPO): C. acnes ব্যাকটেরিয়ার পরিমাণ দ্রুত কমায় এবং সংক্রামিত প্রদাহ নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে।
Salicylic Acid (BHA): লোমকূপে জমে থাকা তেল ও মরা কোষ পরিষ্কার করে। (তবে মনে রাখবেন, কেবল স্যালিসাইলিক অ্যাসিড দিয়ে ত্বকের গভীর নডিউল একা ভালো করা সম্ভব নয়)।
Azelaic Acid: ত্বকের লালচে ভাব, ফোলা প্রদাহ এবং ব্রণের পর রয়ে যাওয়া জেদি কালচে দাগ কমাতে সহায়তা করে।
মৃদু ও Non-comedogenic একটি ক্লিনজার ব্যবহার করুন।যা ত্বক পরিষ্কার করবে কিন্তু অতিরিক্ত শুষ্ক বা টানটান করে ফেলবে না।
যেমন: La Roche-Posay Effaclar Medicated Gel Cleanser, Cetaphil DermaControl Foam Wash
ময়শ্চারাইজার ও সানস্ক্রিন
ত্বক তৈলাক্ত হলেও ময়শ্চারাইজার বাদ দেওয়া যাবে না। সবসময় Oil-free ও Non-comedogenic ময়শ্চারাইজার ব্যবহার করবেন। প্রতিদিন সানস্ক্রিন ব্যবহার করুন। এটি সূর্যের ক্ষতিকর রশ্মি থেকে সেনসিটিভ ত্বককে বাঁচায় এবং ব্রণের পর স্থায়ী কালচে দাগ পড়া ঠেকায়।
যেহেতু নডিউল ও সিস্ট ত্বকের অনেক গভীরে থাকে, তাই নিজে থেকে সিরাম বা ক্রিম ব্যবহারে এগুলো পুরোপুরি না-ও সারতে পারে। ডার্মাটোলজিস্টরা সাধারণত নিচের চিকিৎসাগুলো দিয়ে থাকেন
Adapalene / Tretinoin & Benzoyl Peroxide: উচ্চমাত্রার টপিক্যাল ক্রিম।
Prescription Oral Antibiotics: মাঝারি থেকে গুরুতর প্রদাহ দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনতে নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য।
Isotretinoin: মারাত্মক নডিউলার অ্যাকনে বা স্থায়ী গর্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকলে চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের কড়া তত্ত্বাবধানে এটি দেওয়া হয়।
Hormonal Treatment: যেসব নারীর হরমোনের ভারসাম্যহীনতার কারণে সিস্ট হয়, তাদের বিশেষ থেরাপি দেওয়া হয়।
Cortisone Injection: অনেক বড়, ফোলা ও মারাত্মক ব্যথাদায়ক সিস্ট বা নডিউল মাত্র ২৪-৪৮ ঘণ্টার মধ্যে বসিয়ে দিতে চিকিৎসকরা সরাসরি ব্রণে ইনজেকশন দিয়ে থাকেন।
নডিউলার বা সিস্টিক অ্যাকনে কোনো সাধারণ বিউটি প্রবলেম নয়, এটি একটি মেডিকেল কন্ডিশন। বাজারে পাওয়া যাওয়া দামী সিরাম বা অন্যের কথায় বিভ্রান্ত না হয়ে, যত দ্রুত সম্ভব একজন রেজিস্টার্ড চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হন।
বিশেষ সতর্কতা: বিশেষ করে Isotretinoin, Oral Antibiotics কিংবা Hormonal Treatment কখনোই নিজে নিজে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া শুরু বা বন্ধ করবেন না।
স্কিনকেয়ার প্রোডাক্টের পাশাপাশি ঘরোয়া উপায়ে যত্ন নেওয়া এবং জীবনযাত্রায় সঠিক পরিবর্তন আনা ব্রণ দ্রুত নিয়ন্ত্রণে বেশ বড় ভূমিকা রাখে। আসুন জেনে নেই কিছু ঘরোয়া উপায়ঃ
নিম ও কাঁচা হলুদের প্যাক: নিম ও হলুদের শক্তিশালী অ্যান্টি-ব্যাকটেরিয়াল উপাদান ব্রণ তৈরি করা জীবাণু মারে এবং ত্বকের লালচে ফোলা ভাব কমায় (১০–১৫ মিনিট মুখে রেখে ঠান্ডা পানিতে ধুয়ে ফেলুন, সপ্তাহে ২–৩ দিন)।
অ্যালোভেরা জেল: ব্যথাদায়ক ও সংবেদনশীল ব্রণের প্রদাহ, ফোলা ভাব এবং জ্বালাপোড়া শান্ত করতে জাদুকরী কাজ করে।
গ্রিন টি টোনার: এতে থাকা অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট ত্বকের অতিরিক্ত তেল উৎপাদন নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে।
খাদ্যাভ্যাসে সচেতনতা: অতিরিক্ত চিনি, কোল্ড ড্রিংকস, ফাস্টফুড এবং প্রসেসড ফুড শরীরে ইনসুলিনের মাত্রা বাড়িয়ে তেলগ্রন্থি অতিসক্রিয় করে তোলে, যা ব্রণ বাড়ায়।
পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ: খাদ্যতালিকায় সবুজ শাকসবজি, রঙিন ফলমূল (যেমন: বেরি, গাজর, শসা) এবং ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড সমৃদ্ধ খাবার (যেমন: বাদাম ও বীজ) যুক্ত করুন।
পর্যাপ্ত ঘুম: প্রতিদিন রাতে অন্তত ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা নিবিড় ঘুম প্রয়োজন। ঘুম কম হলে ত্বকের স্বাভাবিক পুনর্গঠন প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয়।
বালিশের কভার ও তোয়ালে পরিচ্ছন্নতা: প্রতি ৩–৪ দিন পর পর বালিশের কভার পরিবর্তন করুন। জমা হওয়া তেল, ধুলোবালি ও মরা কোষ ঘুমানোর সময় মুখে লেগে ব্রণ বাড়িয়ে দেয়।
ত্বকে ব্রণ ওঠার বিষয়টি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক এবং সঠিক পরিচর্যার মাধ্যমে এটি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। মনে রাখবেন, কোনো স্কিনকেয়ার প্রোডাক্ট বা ঘরোয়া উপাদান রাতারাতি ফল দেয় না। তাই আপনার ত্বকের ধরণ অনুযায়ী নিয়ম মেনে স্কিনকেয়ার চালিয়ে যান ত্বককে ভালোবাসুন, স্বাস্থ্যকর জীবনযাত্রা বজায় রাখুন এবং প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।