জানুন কোন বয়সে প্রেসার কত থাকা উচিত
August 13, 2026
August 13, 2026
মাথাব্যথা হলেই হাই প্রেসার, আর মাথা ঘুরলেই লো প্রেসার—এমন ধারণা আমাদের অনেকেরই আছে। কিন্তু রক্তচাপের ক্ষেত্রে শরীরের কিছু লক্ষণ সবসময় সঠিক সংকেত দেয় না। কখনো কোনো উপসর্গ ছাড়াই প্রেসার বেড়ে থাকতে পারে। আবার প্রেসার মাপতে গিয়ে ১২০/৮০, ১৩০/৮৫ বা ১৪০/৯০—এমন সংখ্যা দেখে অনেকেই চিন্তায় পড়ে যান। কিন্তু রক্তচাপ বোঝার জন্য শুধু একটি সংখ্যা বা একটি উপসর্গই যথেষ্ট নয়। কোন বয়সে কতটা প্রেসার স্বাভাবিক, কখন সেটিকে বেশি বা কম বলা হয় এবং কোন লক্ষণে সতর্ক হওয়া দরকার—এসব জানা তাই জরুরি। চলুন জেনে নেই কোন বয়সে প্রেসার কত থাকা উচিত।
রক্তচাপ বা প্রেসার বুঝতে হলে আগে জানতে হবে, আমাদের শরীরে রক্ত কীভাবে চলাচল করে। আমাদের হৃদ্যন্ত্র অনেকটা পাম্পের মতো কাজ করে। এটি সংকুচিত ও প্রসারিত হয়ে সারা শরীরে রক্ত পৌঁছে দেয়। হৃদ্যন্ত্র অক্সিজেনসমৃদ্ধ রক্ত সারা শরীরে পাম্প করে। শরীরের বিভিন্ন অংশে অক্সিজেন পৌঁছে দেওয়ার পর রক্তে অক্সিজেনের পরিমাণ কমে যায়। এই রক্ত শিরার মাধ্যমে আবার হৃদ্যন্ত্রের ডান দিকে ফিরে আসে। সেখান থেকে হৃদ্যন্ত্র রক্তকে ফুসফুসে পাঠায়। ফুসফুসে রক্ত নতুন করে অক্সিজেন গ্রহণ করে। এরপর অক্সিজেনসমৃদ্ধ রক্ত হৃদ্যন্ত্রের বাম দিকে ফিরে আসে। হৃদ্যন্ত্রের বাম নিলয় তখন সংকুচিত হয়ে এই রক্তকে মহাধমনি (Aorta) দিয়ে সারা শরীরে পাঠিয়ে দেয়। রক্ত যখন ধমনির ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হয়, তখন ধমনির দেয়ালে চাপ তৈরি করে। ধমনির দেয়ালে প্রবাহিত রক্তের এই চাপই হলো রক্তচাপ বা Blood Pressure। হৃদ্যন্ত্র সাধারণত বিশ্রাম অবস্থায় প্রতি মিনিটে ৬০ থেকে ১০০ বার স্পন্দিত হয়। প্রতিবার হৃদ্যন্ত্র সংকুচিত হয়ে রক্ত পাম্প করার সময় ধমনিতে চাপ তৈরি হয়। এভাবেই দিন-রাত অবিরাম চলতে থাকে রক্ত সঞ্চালনের এই প্রক্রিয়া।
| সিস্টোলিক / ডায়াস্টোলিক (mmHg) | রক্তচাপের পর্যায় | সাধারণ অর্থ ও নির্দেশিকা |
| ৯০/৬০-এর নিচে | নিম্ন রক্তচাপ (Hypotension) | সাধারণ অপেক্ষা কম; উপসর্গ (মাথা ঘোরা, দুর্বলতা) থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। |
| ১২০/৮০-এর আশেপাশে | স্বাভাবিক (Normal) | এটি আদর্শ ও অত্যন্ত স্বাস্থ্যকর রক্তচাপের পরিমাপ। |
| ১২০–১২৯ / ৮০-এর কম | কিছুটা বেশি (Elevated) | রক্তচাপের পূর্বাবস্থা; সঠিক জীবনযাত্রা ও খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন আনা জরুরি। |
| ১৩০–১৩৯ / ৮০–৮৯ | উচ্চ রক্তচাপ: পর্যায় ১ (Stage 1) | রক্তচাপ মৃদু বেশি; ঝুঁকি এড়াতে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন। |
| ১৪০/৯০ বা তার বেশি | উচ্চ রক্তচাপ: পর্যায় ২ (Stage 2) | উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি বহুগুণ বেশি; চিকিৎসকের পরামর্শে ওষুধ প্রয়োজন হতে পারে। |
| ১৮০/১২০ বা তার বেশি | জরুরি অবস্থা (Hypertensive Crisis) | এটি অত্যন্ত বিপজ্জনক অবস্থা; অবিলম্বে জরুরি চিকিৎসাসেবা নেওয়া আবশ্যক। |
রক্তচাপ পরিমাপের সময় দুটি সংখ্যা বলা হয় (যেমন: ১২০/৮০ mmHg)। এখানে mmHg বা মিলিমিটার অব মার্কারি হলো রক্তচাপের একক।
রক্ত পাম্প করার জন্য হৃদ্যন্ত্রের পেশি যখন সংকুচিত হয়, তখন এটি রক্তকে জোরে ধমনির মধ্যে ঠেলে দেয়। এ সময় ধমনির ভেতরে রক্তের চাপ সবচেয়ে বেশি থাকে। এই সর্বোচ্চ চাপকে বলা হয় সিস্টোলিক প্রেসার। যেমন, কারও রক্তচাপ যদি ১২০/৮০ mmHg হয়, তাহলে ১২০ হলো সিস্টোলিক প্রেসার। অর্থাৎ হৃদ্যন্ত্র সংকুচিত হয়ে রক্ত পাম্প করার সময় ধমনিতে সর্বোচ্চ চাপ ছিল ১২০ mmHg।
হৃদ্যন্ত্র সব সময় সংকুচিত থাকে না। প্রতিবার রক্ত পাম্প করার পর এটি কিছুটা শিথিল হয় এবং পরবর্তী স্পন্দনের জন্য প্রস্তুত হয়। এই সময় হৃদ্যন্ত্র থেকে নতুন করে রক্ত জোরে বের হয় না। তবে ধমনিতে রক্ত চলাচল অব্যাহত থাকে এবং সেখানে একটি নির্দিষ্ট চাপ বজায় থাকে। এই সময়ের ধমনির চাপকে বলা হয় ডায়াস্টোলিক প্রেসার। তাই ১২০/৮০ mmHg রক্তচাপের ক্ষেত্রে ৮০ হলো ডায়াস্টোলিক প্রেসার।
রক্তচাপ দীর্ঘদিন বেশি থাকলে হৃদ্যন্ত্রকে রক্ত পাম্প করার জন্য বেশি পরিশ্রম করতে হয়। একই সঙ্গে ধমনির দেয়ালের ওপরও অতিরিক্ত চাপ পড়ে। সময়ের সঙ্গে এই বাড়তি চাপ ধমনির ক্ষতি করতে পারে এবং হৃদ্যন্ত্র, মস্তিষ্ক, কিডনি ও চোখের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। এর ফলে হৃদ্রোগ, স্ট্রোক, কিডনি রোগ ও দৃষ্টিশক্তির সমস্যার ঝুঁকি বাড়তে পারে। উচ্চ রক্তচাপের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, অনেকের ক্ষেত্রেই কোনো স্পষ্ট লক্ষণ থাকে না। তাই শুধু শরীরে কোনো উপসর্গ হচ্ছে কি না, তা দেখে উচ্চ রক্তচাপ বোঝা যায় না। নিয়মিত রক্তচাপ মাপাই এটি শনাক্ত করার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য উপায়।
রক্তচাপ খুব কমে গেলে শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলোতে প্রয়োজনীয় পরিমাণ রক্ত ও অক্সিজেন পৌঁছাতে সমস্যা হতে পারে। এর ফলে মাথা ঘোরা, দুর্বল লাগা, চোখ ঝাপসা দেখা, বমি বমি ভাব, ক্লান্তি বা অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে। হঠাৎ করে রক্তচাপ অনেক কমে গেলে গুরুতর মস্তিষ্ক, হৃদ্যন্ত্র ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গে রক্তপ্রবাহ কমে যেতে পারে। তবে সবার জন্য একই রক্তচাপকে ‘কম’ বা ‘বেশি’ বলা যায় না। রক্তচাপের মাত্রা, উপসর্গ, বয়স, শারীরিক অবস্থা এবং অন্য কোনো রোগ আছে কি না—সবকিছু বিবেচনা করে এর গুরুত্ব নির্ধারণ করা হয়।
বাড়িতে রক্তচাপ মাপার সময় কয়েকটি বিষয় খেয়াল রাখুন—
নিয়মিত রক্তচাপ পরীক্ষা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ—
মনে রাখবেন: বাড়িতে পাওয়া রিডিং দেখে নিজের ইচ্ছায় প্রেসারের ওষুধ বন্ধ করা বা মাত্রা পরিবর্তন করা উচিত নয়।
সাধারণভাবে প্রাপ্তবয়স্ক নারী ও পুরুষের স্বাভাবিক রক্তচাপের রক্তচাপের মানদণ্ড একই। শুধু নারী বা পুরুষ হওয়ার কারণে আলাদা মাত্রা নির্ধারিত হয় না। বয়স, ওজন, শারীরিক গঠন, জীবনযাপন, হরমোনের পরিবর্তন এবং বিভিন্ন রোগের কারণে একজনের রক্তচাপ আরেকজনের তুলনায় কিছুটা কম বা বেশি হতে পারে।
কত হলে হাই প্রেসার বা উচ্চ রক্তচাপ বলা হয়?
প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে রক্তচাপ বারবার ১৩০/৮০ mmHg বা তার বেশি পাওয়া গেলে তা উচ্চ রক্তচাপের পর্যায়ে পড়তে পারে। ১৪০/৯০ mmHg বা তার বেশি হলে উচ্চ রক্তচাপের মাত্রা আরও বেশি। তবে একবারের রিডিং দেখে হাই প্রেসার নিশ্চিত করা হয় না। সঠিক নিয়মে একাধিকবার রক্তচাপ মেপে চিকিৎসক ফলাফল মূল্যায়ন করেন।
গর্ভাবস্থায় রক্তচাপ ১৪০/৯০ mmHg বা তার বেশি হলে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন, বিশেষ করে এমন রিডিং বারবার এলে। আর ১৬০/১১০ mmHg বা তার বেশি হলে এটি গুরুতর উচ্চ রক্তচাপ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে এবং দ্রুত চিকিৎসা প্রয়োজন। সঙ্গে তীব্র মাথাব্যথা, চোখে ঝাপসা দেখা, পেটের ওপরের দিকে ব্যথা, শ্বাসকষ্ট বা হঠাৎ বেশি ফোলা থাকলে দ্রুত চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করা জরুরি।
না। একবার রক্তচাপ বেশি পাওয়া গেলেই কাউকে উচ্চ রক্তচাপের রোগী বলা যায় না। রক্তচাপ বিভিন্ন কারণে সাময়িকভাবে বেড়ে যেতে পারে। যেমন—রক্তচাপ মাপার ঠিক আগে ব্যায়াম বা দ্রুত হাঁটা, সিঁড়ি ভাঙা, চা-কফি বা অন্য ক্যাফেইনযুক্ত পানীয় পান করা, ধূমপান, মানসিক চাপ বা উদ্বেগ। এমনকি ভুল আকারের কাপ ব্যবহার করা বা কাপটি সঠিকভাবে না বাঁধলেও রিডিং প্রভাবিত হতে পারে। তাই একটি মাত্র রিডিংয়ের ওপর ভিত্তি করে উচ্চ রক্তচাপের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় না। সাধারণত সঠিক নিয়মে, বিশ্রাম নিয়ে একাধিকবার রক্তচাপ মাপা এবং প্রয়োজন হলে বাড়িতে কয়েক
সাধারণভাবে ৯০/৬০ mmHg-এর নিচের রক্তচাপকে নিম্ন রক্তচাপ (Low BP বা Hypotension) হিসেবে ধরা হয়। তবে শুধু রক্তচাপের সংখ্যা কম হলেই যে সমস্যা হয়েছে, এমন নয়। কিছু মানুষের রক্তচাপ স্বাভাবিকভাবেই কিছুটা কম থাকতে পারে এবং তাদের কোনো উপসর্গ নাও থাকতে পারে। বিষয়টি বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে যখন রক্তচাপ কমার সঙ্গে মাথা ঘোরা, দুর্বল লাগা, চোখে ঝাপসা দেখা, অজ্ঞান হয়ে যাওয়া বা বিভ্রান্তির মতো উপসর্গ দেখা দেয়। রক্তচাপ কমে যাওয়ার বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে। যেমন পানিশূন্যতা, অতিরিক্ত রক্তপাত, কিছু ওষুধ, গুরুতর সংক্রমণ বা হৃদ্যন্ত্রের কিছু সমস্যা। তাই শুধু রক্তচাপের সংখ্যা নয়, সঙ্গে কোনো উপসর্গ আছে কি না এবং কেন রক্তচাপ কমেছে—সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। দিনের রিডিং বা চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী অন্যান্য পরিমাপের ফল বিবেচনা করা হয়।
না। বয়স বাড়ার সঙ্গে উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি বাড়তে পারে। কিন্তু তাই বলে বেশি রক্তচাপকে বয়সের স্বাভাবিক পরিবর্তন হিসেবে ধরে নেওয়া ঠিক নয়। বিশেষ করে বারবার রক্তচাপ বেশি পাওয়া গেলে কারণ খুঁজে বের করা এবং প্রয়োজন হলে চিকিৎসা নেওয়া জরুরি।
১৮০/১২০ mmHg বা তার বেশি রক্তচাপ খুবই বেশি। কয়েক মিনিট শান্তভাবে বসে আবার রক্তচাপ মাপুন। একই রকম বেশি থাকলে দ্রুত চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করা প্রয়োজন।