টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিক: সত্যিই কি ক্ষতিকর? জানুন গবেষণা ও করণীয়
July 30, 2026
July 30, 2026
প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে এবং রাতে ঘুমানোর আগে টুথপেস্ট দিয়ে দাঁত ব্রাশ করা আমাদের দৈনন্দিন অভ্যাস। দাঁত ও মুখের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে নিয়মিত ব্রাশ করার গুরুত্বও অনেক। কিন্তু প্রতিদিনের সেই টুথপেস্ট নিয়েই এখন উঠেছে নতুন প্রশ্ন।
সাম্প্রতিক এক গবেষণায় বাংলাদেশের বাজারে বিক্রি হওয়া বেশ কিছু টুথপেস্টের নমুনায় মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত হওয়ার দাবি করা হয়েছে। এমনকি শিশুদের জন্য তৈরি কিছু টুথপেস্টের নমুনাতেও মিলেছে এই অতি ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা। এই তথ্য সামনে আসার পর সারা দেশজুড়ে তৈরি হয়েছে উদ্বেগ ও নানা প্রশ্ন।
কিন্তু এই খবর শুনেই কি টুথপেস্ট ব্যবহার বন্ধ করে দেওয়া উচিত, নাকি বিষয়টি একটু গভীরভাবে বুঝে নেওয়া প্রয়োজন? আসুন, একনজরে দেখে নেওয়া যাক গবেষণার আসল তথ্য, স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং এ বিষয়ে সরকারি উদ্যোগ।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা বাংলাদেশে এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (ESDO) সম্প্রতি টুথপেস্ট নিয়ে একটি গবেষণার তথ্য প্রকাশ করেছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘এনভায়রনমেন্টাল হেলথ অ্যান্ড ইকোটক্সিকোলজি ল্যাবরেটরিতে’ পরিচালিত হয়। তারা বাজারের ১৯টি ব্র্যান্ডের মোট ৩৪টি টুথপেস্ট পরীক্ষা করে। এর মধ্যে ২৬টি টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়ার যায়। পরীক্ষার তথ্যানুযায়ী, দেশীয় উৎপাদনের পাশাপাশি কিছু আমদানিকৃত টুথপেস্টের নমুনাতেও ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা পাওয়া গেছে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, প্রতি ১০০ গ্রাম টুথপেস্টে ২০ থেকে ৩২০টি পর্যন্ত মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা পাওয়া গেছে।
তবে স্বস্তির কথা হলো, পরীক্ষিত ৩৪টি নমুনার মধ্যে ৮টি টুথপেস্টে কোনো ধরনের মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া যায়নি।
সাধারণত ৫ মিলিমিটারের চেয়ে ছোট প্লাস্টিকের কণাকেই মাইক্রোপ্লাস্টিক বলা হয়। এসব কণা এতটাই ছোট হতে পারে যে অনেক ক্ষেত্রে খালি চোখে দেখা কঠিন।উৎস ও তৈরির ধরন অনুযায়ী বিজ্ঞানীরা এদের প্রধানত দুটি ভাগে ভাগ করে থাকেন:
প্রাথমিক মাইক্রোপ্লাস্টিক (Primary): কোনো নির্দিষ্ট পণ্যে ব্যবহারের উদ্দেশ্যে শুরু থেকেই ছোট প্লাস্টিক কণা বা দানা হিসেবে তৈরি করা হলে তাকে প্রাথমিক মাইক্রোপ্লাস্টিক বলা হয়।
মাধ্যমিক মাইক্রোপ্লাস্টিক (Secondary): বড় প্লাস্টিকের বোতল, ব্যাগ, পলিথিন বা কাপড় রোদ, তাপ ও ঘর্ষণে আস্তে আস্তে ক্ষয়ে ছোট ছোট কণায় পরিণত হয়। এভাবেই বড় প্লাস্টিক থেকে তৈরি হওয়া ক্ষুদ্র কণাকে মাধ্যমিক মাইক্রোপ্লাস্টিক বলা হয়।
টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি নিয়ে সাধারন ভোক্তাদের কৌতূহল ও উদ্বেগ বাড়া স্বাভাবিক। তবে আরও বিস্তারিত ল্যাবরেটরি পরীক্ষা ছাড়া টুথপেস্টে এসব কণা ঠিক কীভাবে এসেছে, তা এখনই শতভাগ নিশ্চিত করে বলা কঠিন। তবে গবেষকদের মতে, নিম্ন সম্ভাব্য কয়েকটি উৎস থেকে টুথপেস্টে এই প্লাস্টিক কণাগুলো মিশে যেতে পারে:
অতীতে অনেক প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান টুথপেস্টে পলিইথিলিনের তৈরি অতি ক্ষুদ্র গোলাকার প্লাস্টিক দানা (Microbeads) ব্যবহার করত। এর মূল উদ্দেশ্য ছিলো দাঁতকে মৃদু ঘষে পরিষ্কার করা (Mild abrasive) এবংএবং পেস্টে এক ধরনের আকর্ষণীয় চকচকে ভাব আনা। তবে স্বাস্থ্য ও পরিবেশগত ঝুঁকির কথা বিবেচনা করে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও কানাডাসহ বিশ্বের বহু দেশে বর্তমানে প্রসাধনী ও টুথপেস্টে এটি আইন করে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
টুথপেস্টের ঘনত্ব ধরে রাখতে এবং পেস্ট যেন দ্রুত শুকিয়ে না যায়, সেজন্য কিছু কৃত্রিম পলিমার ব্যবহার করা হয়।তবে কোনো উপাদানের নামের শেষে 'পলিমার' থাকা মানেই কিন্তু সেটি ক্ষতিকর প্লাস্টিক কণা নয়। এটি সম্পূর্ণ নির্ভর করে ওই উপাদানটির রাসায়নিক গঠন এবং পানিতে এটি সহজে দ্রবীভূত হয় কি না তার ওপর।
টুথপেস্ট তৈরির সময় কারখানার পাইপলাইন, পানির ফিল্টার কিংবা বাতাস থেকেও অনিচ্ছাকৃতভাবে কিছু প্লাস্টিক কণা মিশ্রণে যুক্ত হতে পারে। পণ্য ও কারখানাভেদে এই দূষণের মাত্রা ভিন্ন হয়।
টুথপেস্ট সংরক্ষণে প্লাস্টিকের বহুস্তরবিশিষ্ট টিউব ব্যবহার করা হয়। দীর্ঘদিন ধরে টিউবের ভেতরে পেস্ট আটকে থাকলে টিউবের ভেতরের দেয়াল থেকে কিছু প্লাস্টিক কণা টুথপেস্টে মিশে যেতে পারে।
ল্যাবে নমুনা পরীক্ষার সময় সম্পূর্ণ অনিচ্ছাকৃতভাবে বাইরে থেকেও প্লাস্টিক কণা যুক্ত হতে পারে। পরীক্ষা করার পাত্র, গবেষণাগারের বাতাস কিংবা গবেষকদের ব্যবহৃত কৃত্রিম তন্তুর পোশাক থেকে অতি সূক্ষ্ম প্লাস্টিক অণু খসে পড়ার সুযোগ থাকে। তবে এই ভুল এড়াতে বিজ্ঞানীরা 'ব্ল্যাঙ্ক টেস্ট', বিশেষ পরিষ্কার সরঞ্জাম এবং সুনিয়ন্ত্রিত পরীক্ষাগার পরিবেশ ব্যবহার করে কাজ করেন।
আমরা সাধারণত দাঁত ব্রাশ করার পর মুখ ধুয়ে টুথপেস্ট থুতু ফেলে দিই। তাই টুথপেস্টের পুরোটা শরীরে প্রবেশ করে না। তারপরও বেশ কিছু উপায়ে টুথপেস্টের মাইক্রোপ্লাস্টিক মানবদেহে কিংবা পরিবেশের মাধ্যমে আমাদের শরীরে চলে আসতে পারে।
দাঁত ব্রাশ করার সময় টুথপেস্ট লালার সঙ্গে মিশে যায়। অজান্তেই সামান্য পরিমাণ পেস্ট লালার সঙ্গে গিলে ফেলা খুব স্বাভাবিক। এটিই টুথপেস্ট থেকে সরাসরি মানবদেহে প্লাস্টিক প্রবেশের সবচেয়ে প্রধান ও প্রত্যক্ষ মাধ্যম।
ছোট শিশুরা প্রায়ই ঠিকমতো থুতু ফেলতে পারে না। এ ছাড়া রঙিন ও মিষ্টি স্বাদ বা ফলের গন্ধযুক্ত টুথপেস্ট আকর্ষণীয় লাগায় বাচ্চারা তা আনন্দের সঙ্গেই গিলে ফেলে। । ফলে তাদের শরীরে মাইক্রোপ্লাস্টিকের প্রবেশের মাত্রা বেশি হতে পারে।
দাঁত ব্রাশ করার সময় টুথপেস্ট সরাসরি জিভ, মাড়ি ও মুখের ভেতরের সংবেদনশীল পর্দা বা মিউকোসার (Mucosa) সংস্পর্শে আসে। তবে এই সংস্পর্শের মাধ্যমে মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা আসলে রক্তে বা শরীরে কতটা শোষিত হয়, তার সুনির্দিষ্ট প্রমাণ এখনো সীমিত। এটি বর্তমানে চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের একটি গবেষণাধীন বিষয়।
টুথপেস্টের মাইক্রোপ্লাস্টিক পরিবেশ ঘুরেও আমাদের দেহে ফিরে আসে।ব্রাশ শেষে কুলকুচি করা পানি ড্রেন দিয়ে নদী, জলাশয় ও সমুদ্রে গিয়ে পড়ে। জলজ প্রাণী ও মাছ এই প্লাস্টিক কণা খাদ্য ভেবে গ্রহণ করে। পরবর্তীতে সেই মাছ, দূষিত পানি বা কৃষিপণ্যের মাধ্যমে কণাগুলো আবার আমাদের খাবার টেবিলে ফিরে আসে।
মাইক্রোপ্লাস্টিক এখন আর কেবল সমুদ্র বা মাটিতে সীমাবদ্ধ নয়—এটি আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্ট্যানফোর্ড মেডিসিনের গবেষক ও চিকিৎসকরা হিসাব করে দেখেছেন, একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ সপ্তাহে গড়ে একটি ক্রেডিট কার্ডের সমপরিমাণ প্লাস্টিক অজান্তেই শরীরে গ্রহণ করেন!
তবে মাইক্রোপ্লাস্টিক মানবস্বাস্থ্যে ঠিক কী পরিমাণ ক্ষতি করে এবং দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব কতটা—এ বিষয়ে গবেষণা এখনো চলমান।
হৃদরোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি: ২০২৪ সালের মার্চে প্রকাশিত New England Journal of Medicine-এর একটি গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব রক্তনালীর ব্লকেজে মাইক্রোপ্লাস্টিক ছিল, তাদের হৃদরোগ, স্ট্রোক ও মৃত্যুর ঝুঁকি প্লাস্টিকমুক্ত রোগীদের চেয়ে অনেক বেশি।
কোষ ও জিনগত পরিবর্তন: মাইক্রোপ্লাস্টিক ও ন্যানোপ্লাস্টিক সরাসরি শরীরের স্বাভাবিক কোষগুলোতে ঢুকে পড়তে পারে। এগুলো কোষের ভেতরে প্রবেশ করে জিনের স্বাভাবিক আচরণ ও গঠন বদলে দেয়, যার ফলে রক্তনালী ও অভ্যন্তরীণ অঙ্গগুলোতে স্থায়ী রোগ বা জটিলতা তৈরি হয়।
ক্যানসারের সম্ভাবনা: গবেষণায় দেখা গেছে, মাইক্রোপ্লাস্টিক কোলন ক্যানসার ও ফুসফুসের ক্যানসারের ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়। পরিবেশগত টক্সিকোলজি গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, শরীরে জমে থাকা মাইক্রোপ্লাস্টিক অক্সিডেটিভ স্ট্রেস এবং কোষের মৃত্যু (Cell Death) ঘটায়, যা সরাসরি ক্যানসার সৃষ্টির জন্য দায়ী।
কোষের একদম গভীরে (DNA ও নিউক্লিয়াসে) প্রবেশে সক্ষমঃ হার্ভার্ড চ্যান স্কুলের গবেষক দল দেখিয়েছেন যে, ১ মাইক্রোমিটারের চেয়ে ছোট প্লাস্টিক কণা, অর্থাৎ ন্যানোপ্লাস্টিক মানবদেহের কোষকে ভেদ করে সোজা কোষের নিউক্লিয়াসে প্রবেশ করতে পারে। যা ডিএনএ ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং জিনের স্বাভাবিক গঠনে মিউটেশন বা পরিবর্তন ঘটাতে পারে।
ব্যাকটেরিয়া বহনের মাধ্যম ঃমাইক্রোপ্লাস্টিকের উপরিভাগ বিপজ্জনক ব্যাকটেরিয়া ও রোগজীবাণুর বেঁচে থাকার স্থান হিসেবে কাজ করে। এগুলো শরীরের ভেতরে ব্যাকটেরিয়া বহন করে নিয়ে আসে। আবার প্লাস্টিকের কণাগুলো নিজের ভেতরেই মারাত্মক ক্ষতিকর কেমিক্যাল ধারণ করে, যা ধীরে ধীরে আমাদের শরীরে ছড়ায়। যার ফলে শরীরে কোনো ইনফেকশন বা সংক্রমণ হলে তা সাধারণ ওষুধ প্রয়োগে সারিয়ে তোলা কঠিন হয়ে পড়ে।
অন্ত্রের মাইক্রোবায়োম ও হজমপ্রক্রিয়ার বিনাশঃ আমাদের পরিপাকতন্ত্রে হজমপ্রক্রিয়া ও রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা স্বাভাবিক রাখার জন্য কিছু উপকারী ব্যাকটেরিয়া বা 'গাট মাইক্রোবায়োম' থাকে। মাইক্রোপ্লাস্টিক পেটে ঢুকলে এসব উপকারী ব্যাকটেরিয়ার ভারসাম্য পুরোপুরি নষ্ট করে দেয়। এর ফলে গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা, ফ্যাটি লিভার, হরমোনের অসমতা এবং শরীরের সার্বিক বিপাকপ্রক্রিয়ায় বড় ধরনের বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়।
তবে মাইক্রোপ্লাস্টিকের সম্ভাব্য স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে গবেষণা এখনো চলমান। আতঙ্কিত না হয়ে সচেতন হওয়া এবং অপ্রয়োজনীয় প্লাস্টিক কমিয়ে এনে স্বাস্থ্যকর জীবনধারা মেনে চলাই আমাদের এবং আমাদের পরিবারের সুস্থতার সর্বোত্তম উপায়।
সম্প্রতি জরিপে এটিও দেখা গেছে, পরীক্ষায় ৬টি শিশুতোষ টুথপেস্টের মধ্যে ৪টিতেই (৬৬.৭%) মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি মিলেছে। প্রতি ১০০ গ্রাম পেস্টে কণার পরিমাণ ছিল:
কোদোমো আল্ট্রা শিল্ড ফর্মুলা (স্ট্রবেরি): ১৪০টি কণা (সর্বোচ্চ)
মেরিল বেবি স্ট্রবেরি: ৬০টি কণা
মেরিল বেবি অরেঞ্জ: ৪০টি কণা
পেপসোডেন্ট কিডস অরেঞ্জ: ২০টি কণা
এই তথ্যগুলো জানার পর অভিভাবকদের শিশুদের বিষয়ে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করা অত্যন্ত জরুরি।
না, একদমই নয়! শুধু মাইক্রোপ্লাস্টিকের খবরের কারণে টুথপেস্ট ব্যবহার বন্ধ করে দেওয়া মোটেই বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। দাঁতের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় টুথপেস্ট একটি অতি প্রয়োজনীয় উপাদান। এটি বন্ধ করে দিলে স্বাস্থ্যগত ঝুঁকির চেয়ে দাঁতের ক্ষয়ক্ষতির ঝুঁকিই বহুগুণ বেড়ে যাবে।
গবেষণার খবর দেখে আতঙ্কিত হয়ে নিচের সিদ্ধান্তগুলো নেওয়া মোটেও যুক্তিসংগত নয়:
প্লাস্টিকের আতঙ্ক এড়াতে ব্রাশ করা বন্ধ করার দরকার নেই। মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া যায়নি এমন টুথপেস্ট বাছাই করুন। তারসাথে সঠিক কিছু নিয়ম মেনে চলুন:
সঠিক নিয়মে কুলি করুন। ব্রাশ করার পর মুখের ফেনা ও অবশিষ্টাংশ ভালোভাবে কুলকুচি করে ফেলে দিন, যাতে পেস্ট পেটে চলে না যায়।
সচেতনতা বজায় রাখুন। বিএসটিআই অনুমোদিত ও মানসম্মত পেস্ট ব্যবহার করুন ।
শিশুদের অবশ্যই নিজের উপস্থিতিতে মটরশুঁটির দানার সমপরিমাণ (Pea-sized) পেস্ট দিয়ে ব্রাশ করান।
গবেষণাগারের পরীক্ষায় নিচের নমুনাগুলোতে কোনো মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া যায়নি:
প্যারোডনট্যাক্স এক্সপার্ট গাম কেয়ার (Parodontax Expert Gum Care)
জেনফ্রেশ (Zenfresh)
প্যারাস্যুট জাস্ট ফর বেবি - আম (Parachute Just for Baby - Mango)
ক্লোজআপ রেড হট জিংক ফ্রেশ টেকনোলজি (Closeup Red Hot Zinc Fresh Technology)
প্যাকেটে নিম্নলিখিত তথ্য আছে কি না পরীক্ষা করুন:
প্রস্তুতকারক বা আমদানিকারকের নাম
যোগাযোগের ঠিকানা
ব্যাচ নম্বর
উৎপাদনের তারিখ ও মেয়াদ শেষ হওয়ার তারিখ
ফ্লুরাইড আছে কিনা নিশ্চিত করুন
Triclosan, Polyethylene (PE), Sodium Lauryl Sulfate থাকলে কেনা থেকে বিরত থাকুন।
ব্যবহারবিধি ও সতর্কতা
অক্ষত ও সিল করা প্যাকেজিং
না। “হারবাল”, “ন্যাচারাল”, “অর্গানিক” বা “কেমিক্যাল-ফ্রি” শব্দগুলো অনেক ক্ষেত্রে বিপণনের ভাষা হিসেবে ব্যবহার করা হয়। সাম্প্রতিক গবেষণাতেও এর প্রমাণ মিলেছে। যেমন— এম. পিএম. হারবাল, ম্যাজিক হারবাল এবং মেসওয়াক-এর মতো প্রাকৃতিক দাবি করা টুথপেস্টগুলোতেও ৪০টির মতো মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা পাওয়া গেছে।
তাই টুথপেস্ট বেছে নেওয়ার সময় শুধু “হারবাল” বা “ন্যাচারাল” লেখা আছে কি না, সেটি না দেখে উপাদান তালিকা, প্রস্তুতকারকের বিশ্বাসযোগ্যতা, মান নিয়ন্ত্রণ, প্রযোজ্য নিয়ন্ত্রক অনুমোদন এবং নির্ভরযোগ্য পরীক্ষার ফলাফল বিবেচনা করা ভালো।
বিএসটিআই (BSTI) যা বলছে
টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি নিয়ে দেশজুড়ে যে আলোড়োন তৈরি হয়েছে, তা গুরুত্বের সঙ্গে পর্যালোচনা করছে জাতীয় মান নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (BSTI)। বিএসটিআই স্পষ্ট করেছে যে, বাংলাদেশে অনুমোদিত মানদণ্ড অনুযায়ী টুথপেস্ট তৈরিতে ব্যবহারের জন্য ৮১টি উপাদানের একটি নির্দিষ্ট তালিকা রয়েছে, যেখানে মাইক্রোপ্লাস্টিকের কোনো উল্লেখ নেই। ফলে কোনো প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান ইচ্ছাকৃতভাবে টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিক ব্যবহার করছে—এমনটি ভাবার কারণ নেই। তবে জনস্বার্থ বিবেচনায় পুরো বিষয়টি যাচাই করতে সংস্থাটি ইএসডিও (ESDO)-এর কাছে পূর্ণাঙ্গ তথ্য চেয়ে স্বাধীন পরীক্ষাগারে পুনঃপরীক্ষার উদ্যোগ নিয়েছে। এই পরীক্ষায় যদি কোনো প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে নির্ধারিত মান অনুসরণ করেনি বা অনুমোদনহীন উপাদান ব্যবহার করেছে বলে প্রমাণিত হয়, তাহলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে বিএসটিআই।
সবশেষে বলা যায়, টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিক নিয়ে উদ্বেগের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হলেও, এ মুহূর্তে আতঙ্কিত হয়ে টুথপেস্ট ব্যবহার বন্ধ করার কারণ নেই। বরং নির্ভরযোগ্য গবেষণার ফলাফল, বিএসটিআই এর পরবর্তী পরীক্ষার তথ্য এবং সরকারি নির্দেশনার দিকে নজর রাখা উচিত।
টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিক নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে যেসব প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে, এক নজরে সহজ ভাষায় সেগুলোর উত্তর জেনে নিন:
ইচ্ছাকৃত উপাদান হিসেবে ব্যবহার, কাঁচামাল বা কারখানার উৎপাদন প্রক্রিয়ার দূষণ, প্লাস্টিক প্যাকেজিং কিংবা পরীক্ষাগারে নমুনা পরীক্ষার সময় দূষণ থেকেও এটি আসতে পারে।
মাইক্রোপ্লাস্টিকের স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে বিশ্বজুড়ে গবেষণা চলছে। তবে টুথপেস্টের কণা সরাসরি মানুষের নির্দিষ্ট কোনো রোগ তৈরি করছে—এমন সরাসরি ও চূড়ান্ত প্রমাণ এখনো সীমিত।
অনিচ্ছাকৃতভাবে অল্প টুথপেস্ট পেটে গেলে আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই। তবে নিয়মিত বা বেশি পরিমাণে গিলে ফেলা উচিত নয়।
সরকারি নিষেধাজ্ঞা না থাকলে হঠাৎ ব্রাশ বন্ধ করবেন না। শিশুকে প্রয়োজনের বেশি টুথপেস্ট দেবেন না (চালের দানার সমান), গিলে না ফেলার অভ্যাস শেখাবেন এবং ব্রাশের সময় পাশে থাকুন।
সরকারি ও স্বাধীন বিজ্ঞানসম্মত পরীক্ষা ছাড়া কোনো ব্র্যান্ডকে নিশ্চিতভাবে মাইক্রোপ্লাস্টিকমুক্ত বলা কঠিন। কেবল মোড়কের গায়ে "Microplastic-free" লেখা দেখে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন না।
সব সময় নয়। উপাদানের তালিকায় পলিমারের নাম থাকলেও সেটি কঠিন প্লাস্টিক কণা কি না তা বোঝা যায় না। আবার অনিচ্ছাকৃত দূষণের কণা লেবেলে লেখা থাকে না।
অবশ্যই নয়। "হারবাল" বা "ন্যাচারাল" লেখার অর্থ এতে উদ্ভিজ্জ উপাদান আছে। এটি মাইক্রোপ্লাস্টিক বা দূষণমুক্ত হওয়ার নিশ্চয়তা দেয় না।
ফ্লুরাইড দাঁতের ক্ষয় প্রতিরোধে অত্যন্ত জরুরি। মাইক্রোপ্লাস্টিক ও ফ্লুরাইড দুটি ভিন্ন বিষয়। ভয়ের কারণে নিজের সিদ্ধান্তে ফ্লুরাইডযুক্ত পেস্ট বাদ দেওয়া ঠিক নয়।
Microplastic হলো ৫ মিলিমিটারের ছোট যেকোনো প্লাস্টিক কণার সাধারণ নাম। আর Microbead হলো নির্দিষ্টভাবে তৈরি ক্ষুদ্র ও গোলাকার প্লাস্টিক কণা। অর্থাৎ, মাইক্রোবিড হলো মাইক্রোপ্লাস্টিকেরই একটি বিশেষ ধরন।
শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সংবাদের ভিত্তিতে তাড়াহুড়ো করে টুথপেস্ট পরিবর্তন বা বন্ধ করার প্রয়োজন নেই। সরকারি নির্দেশনা ও ডেন্টিস্টের পরামর্শ মেনে চলুন।
বিএসটিআই টুথপেস্টের অনুমোদিত উপাদান যাচাই করে। আদালতের নির্দেশে বিএসটিআই ও বিশেষজ্ঞ কমিটি বর্তমানে টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি ও মানদণ্ড পুনর্বিবেচনা করছে।
শুধু পানি দিয়ে ব্রাশ করলে দাঁতের উপরিভাগের ময়লা দূর হলেও ক্যাভিটি ও দাঁতের ক্ষয় রোখা সম্ভব নয়। তাই আতঙ্কিত না হয়ে টুথপেস্টের নিরাপদ ও পরিমিত ব্যবহার বজায় রাখুন।