ভিটামিন ডি ঘাটতির লক্ষণ ও ঝুঁকি
September 2, 2026
September 2, 2026
ক্যালসিয়াম শোষণ, হাড় ও দাঁতের গঠন, পেশির স্বাভাবিক কার্যকারিতা এবং রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার কাজ—সবকিছুর সঙ্গেই ভিটামিন ডি জড়িত। সার্বিক সুস্থতায় ভিটামিন ডি-এর ভূমিকা বহুমুখী হলেও হাড়ের সুরক্ষায় এর অবদান সবচেয়ে বেশি। অথচ বিশ্বব্যাপী প্রায় ১০০ কোটি মানুষ ভিটামিন ডি ঘাটতিতে ভুগছেন এবং জনসংখ্যার প্রায় ৫০ শতাংশের শরীরে রয়েছে এর অপর্যাপ্ততা।
সমস্যা হলো, এই ঘাটতির লক্ষণগুলো অনেক সময় এতটাই অস্পষ্ট বা ধীরে ধীরে প্রকাশ পায় যে আমরা সহজে তা ধরতে পারি না। তাহলে চলুন জেনে নেওয়া যাক, শরীরে কোন কোন লক্ষণ দেখা দিলে বুঝবেন ভিটামিন ডি-এর ঘাটতি হতে পারে।
ভিটামিন ডি একটি চর্বিতে দ্রবণীয় অণুপুষ্টি, যা খাদ্য থেকে শোষিত হতে চর্বির সহায়তা নেয়। রক্তে যখন এই প্রয়োজনীয় উপাদানের মাত্রা স্বাভাবিকের নিচে নেমে যায়, তাকে ‘ভিটামিন ডি ঘাটতি’ বলা হয়।
বয়স অনুযায়ী ভিটামিন ডি-এর দৈনিক চাহিদা:
প্রাপ্তবয়স্ক (১-৭০ বছর): দৈনিক ৬০০ IU (১৫ মাইক্রোগ্রাম)
বয়স্ক (৭০ বছরের বেশি): দৈনিক ৮০০ IU (২০ মাইক্রোগ্রাম)
এই চাহিদা নিয়মিত পূরণ না হলেই আমাদের শরীরে ভিটামিন ডি এর ঘাটতি দেখা দেয়।
তাহলে চলুন জেনে নেওয়া যাক, শরীরে কোন কোন লক্ষণ দেখা দিলে বুঝবেন ভিটামিন ডি-এর ঘাটতি হতে পারে।
আপনি কি পর্যাপ্ত ঘুমানোর পরও সারাদিন ক্লান্ত বোধ করেন? সামান্য কাজ করলেই শক্তি ফুরিয়ে যায়, মন চায় শুধু বসে বা শুয়ে থাকতে? এমন ক্লান্তি যদি নিয়মিত হয়, এর পেছনে কারণ হিসেবে থাকতে পারে ভিটামিন ডি এর ঘাটতি। যেহেতু ভিটামিন ডি শরীরের স্বাভাবিক কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই এর মাত্রা কমে গেলে কিছু মানুষের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে ক্লান্তি, দুর্বলতা বা শক্তিহীনতার অনুভূতি থাকতে পারে।
পেশিতে দুর্বলতা
ভিটামিন ডি পেশির স্বাভাবিক কার্যকারিতার সঙ্গে যুক্ত। এর মাত্রা কম থাকলে পেশির শক্তি কমে যেতে পারে, যা দৈনন্দিন জীবনে এভাবে বোঝা যায়—
সিঁড়ি উঠতে বেশি কষ্ট হওয়া
নিচু জায়গা থেকে উঠতে অসুবিধা
চেয়ার থেকে দাঁড়াতে দুর্বল লাগা
দীর্ঘ সময় হাঁটার পর পা বেশি দুর্বল হয়ে যাওয়া
পেশিতে ব্যথা বা অস্বস্তি
কোনো আঘাত ছাড়াই পা, কোমর, কাঁধ বা শরীরের বিভিন্ন অংশে পেশিতে ব্যথা, টান বা অস্বস্তি ভিটামিন ডি ঘাটতির সঙ্গে দেখা যায়।
হাড়ে ব্যথা
ভিটামিন ডি ক্যালসিয়াম শোষণে সাহায্য করে। দীর্ঘদিন ঘাটতি থাকলে হাড়ের স্বাভাবিক খনিজীকরণ ব্যাহত হয় এবং পিঠ, কোমর, পা বা শরীরের অন্য হাড়ে ব্যথা ও চাপ অনুভূত হতে পারে।
কোমর ও পিঠে ব্যথা
দীর্ঘস্থায়ী ভিটামিন ডি ঘাটতি হাড়ের স্বাস্থ্যে প্রভাব ফেলে। এর ফলে কোমর ও পিঠের ব্যথা দেখা যায়, বিশেষ করে ঘাটতি দীর্ঘদিন ধরে থাকলে।
হাড় দুর্বল হয়ে যাওয়া
গুরুতর ও দীর্ঘস্থায়ী ঘাটতিতে হাড় নরম ও দুর্বল হয়ে যায়। প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে এর ফলে অস্টিওম্যালেশিয়া দেখা দিতে পারে।
সহজে হাড় ভেঙে যাওয়া
হাড় দুর্বল হয়ে গেলে সামান্য আঘাতেও ফ্র্যাকচারের ঝুঁকি বাড়ে। যাদের আগে থেকেই অস্টিওপোরোসিস রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি আরও গুরুত্বপূর্ণ।
শিশুদের হাড়ের বৃদ্ধিতে সমস্যা
শিশুদের দীর্ঘদিন গুরুতর ভিটামিন ডি ঘাটতি থাকলে হাড়ের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও গঠন ব্যাহত হয়। দেখা যেতে পারে—
হাড় দুর্বল হয়ে যাওয়া বা গঠনে পরিবর্তন
পায়ের হাড় বেঁকে যাওয়া
পেশির দুর্বলতা, হাড়ে ব্যথা বা অস্বস্তি
অতিরিক্ত চুল পড়া
কম ভিটামিন ডি-এর মাত্রার সঙ্গে কিছু ধরনের চুল পড়া ও অ্যালোপেশিয়ার সম্পর্ক পাওয়া গেছে। ভিটামিন ডি রিসেপ্টর চুলের ফলিকলের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও কার্যক্রমে ভূমিকা রাখে। তবে চুল পড়ার একমাত্র কারণ ভিটামিন ডি ঘাটতি নয়।
ক্ষত শুকাতে বেশি সময় লাগা
ভিটামিন ডি ত্বকের স্বাভাবিক পুনর্গঠন ও ক্ষত সারানোর প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত। ঘাটতির সঙ্গে ক্ষত ধীরে শুকানোর সম্পর্কও গবেষণায় দেখা গেছে। তবে দীর্ঘদিন ক্ষত না শুকালে ডায়াবেটিস, সংক্রমণ বা রক্তসঞ্চালনের সমস্যাও খতিয়ে দেখা জরুরি।
বারবার অসুস্থ বা সংক্রমণে আক্রান্ত হওয়া
ভিটামিন ডি রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার স্বাভাবিক কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কম ভিটামিন ডি-এর মাত্রার সঙ্গে শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণসহ কিছু সংক্রমণের প্রবণতার সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
দাঁত ও মাড়ির সমস্যা
ভিটামিন ডি ক্যালসিয়াম শোষণে সাহায্য করে বলে এর দীর্ঘস্থায়ী ঘাটতি দাঁত ও হাড়ের স্বাস্থ্যে প্রভাব ফেলে। কম ভিটামিন ডি-এর মাত্রার সঙ্গে দাঁতের ক্ষয় এবং মাড়ির প্রদাহের সম্পর্কও দেখা গেছে।
মুড খারাপ ও বিষণ্নতার লক্ষণ
কম ভিটামিন ডি-এর মাত্রার সঙ্গে বিষণ্নতা ও মুডের সমস্যার সম্পর্ক বিভিন্ন গবেষণায় পাওয়া গেছে। দীর্ঘদিন বিষনতা থাকলে ভিটামিন ডি এর ঘাটতি থাকতে পারে।
ভিটামিন ডি-এর ঘাটতি থাকলে কী ঘটে?
হাইপোক্যালসেমিয়া: শরীরে ভিটামিন ডি না থাকলে অন্ত্র থেকে ক্যালসিয়াম ও ফসফরাস শোষণ মারাত্মকভাবে কমে যায়, যার ফলে রক্তে ক্যালসিয়ামের মাত্রা অস্বাভাবিক নেমে যায়।
সেকেন্ডারি হাইপারপ্যারাথাইরয়েডিজম: রক্তে ক্যালসিয়ামের ঘাটতি পূরণে শরীর স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্যারাথাইরয়েড হরমোনের নিঃসরন বাড়িয়ে দেয়। এই হরমোন রক্তে ক্যালসিয়ামের মাত্রা ঠিক রাখতে হাড় থেকে জমে থাকা ক্যালসিয়াম টেনে বের করে আনে।
হাড় দুর্বল হওয়া: হাড় থেকে ক্যালসিয়াম ক্ষয়ে যাওয়ার কারণে ধীরে ধীরে হাড় তার ঘনত্ব ও শক্তি হারায়।
অস্টিওম্যালেশিয়া: প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে ক্যালসিয়াম ক্ষয়ে হাড় নরম ও দুর্বল হয়ে যায়।
রিকেটস: শিশুদের বাড়ন্ত বয়সে হাড়ের স্বাভাবিক গঠন ব্যাহত হয় এবং পায়ের হাড় বেঁকে যায়।
হাড় ভাঙার ঝুঁকি: সামান্য আঘাতে বা পতন হলেই হাড় ভেঙে যাওয়ার ঝুঁকি কয়েক গুণ বেড়ে যায়।
পেশি ও স্নায়ুর জটিলতা: ক্যালসিয়ামের চরম ভারসাম্যহীনতার কারণে পেশিতে তীব্র টান, খিঁচুনি, শারীরিক দুর্বলতা এবং মানসিক ক্ষেত্রে বিষণ্নতার লক্ষণ দেখা দিতে পারে।
কারা ভিটামিন ডি ঘাটতির ঝুঁকিতে বেশি?
ভিটামিন ডি ঘাটতি যেকোনো বয়সেই হতে পারে। তবে কিছু মানুষের ক্ষেত্রে ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে বেশি থাকে।
যারা নিয়মিত সূর্যের আলো পান না: দিনের বেশিরভাগ সময় ঘর, অফিস বা অন্য কোনো বদ্ধ জায়গায় কাটালে ত্বকে পর্যাপ্ত সূর্যালোক পৌঁছায় না, ফলে শরীরে ভিটামিন ডি তৈরি কম হতে পারে।
গাঢ় ত্বকের মানুষ: ত্বকে মেলানিন বেশি থাকলে সূর্যের UVB রশ্মির প্রভাব কমে যায়। ফলে একই পরিমাণ ভিটামিন ডি তৈরির জন্য তুলনামূলক বেশি সূর্যালোক প্রয়োজন হতে পারে।
যারা শরীরের বেশিরভাগ অংশ ঢাকা পোশাক পরেন: ত্বকের অল্প অংশ সূর্যের আলোতে এলে ভিটামিন ডি তৈরির সুযোগ কমে যায়।
বয়স্ক ব্যক্তি: বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ত্বকের ভিটামিন ডি তৈরির ক্ষমতা কমতে পারে। বিশেষ করে যারা বেশিরভাগ সময় ঘরের ভেতরে থাকেন, তাদের ঝুঁকি আরও বাড়ে।
স্থূলতায় ভুগছেন এমন ব্যক্তি: স্থূলতার সঙ্গে রক্তে কম ভিটামিন ডি মাত্রার সম্পর্ক দেখা যায়।
যাদের অন্ত্রে পুষ্টি শোষণের সমস্যা রয়েছে: সিলিয়াক রোগ, ক্রোনস ডিজিজ বা প্রদাহজনিত অন্ত্রের রোগের মতো সমস্যায় খাদ্য থেকে ভিটামিন ডি ঠিকভাবে শোষিত নাও হতে পারে।
লিভার বা কিডনির কিছু রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি: ভিটামিন ডি শরীরে সক্রিয় ও ব্যবহারের উপযোগী হওয়ার প্রক্রিয়ায় লিভার ও কিডনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
অস্টিওপোরোসিসে আক্রান্ত ব্যক্তি: হাড়ের স্বাস্থ্য দুর্বল থাকলে ভিটামিন ডি-এর ঘাটতি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
শুধু বুকের দুধ খাওয়া শিশু: বুকের দুধে সাধারণত ভিটামিন ডি-এর পরিমাণ কম থাকে। তাই শিশু বিশেষজ্ঞের পরামর্শ অনুযায়ী অতিরিক্ত ভিটামিন ডি প্রয়োজন হতে পারে।
খাবারে ভিটামিন ডি কম পাওয়া ব্যক্তি: তৈলাক্ত মাছ, ডিমের কুসুম বা ভিটামিন ডি-সমৃদ্ধ খাবার খুব কম খেলে খাদ্য থেকে পাওয়া ভিটামিন ডি-এর পরিমাণও কমে যায়।
শরীর ত্বকে সূর্যের মিষ্টি আলো লাগলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভিটামিন ডি তৈরি করে, আর কিছুটা পাওয়া যায় খাবার থেকেও। তবে সূর্যের আলো সহজলভ্য হলেই সবার শরীরে পর্যাপ্ত ভিটামিন ডি তৈরি হয়—এমন নয়। বয়স, ত্বকের রং, জীবনযাপন, ভৌগোলিক অবস্থান ও খাদ্যাভ্যাসসহ বিভিন্ন কারণে এর মাত্রা কমে যেতে পারে।
বাংলাদেশে প্রচুর সূর্যালোক থাকলেও তবু অনেক মানুষের শরীরে ভিটামিন ডি কম পাওয়া যায়। কারণ শুধু রোদেলা দেশে থাকলেই যে শরীর পর্যাপ্ত ভিটামিন ডি তৈরি করবে, বিষয়টি এতটা সহজ নয়। দিনের বেশিরভাগ সময় ঘর, অফিস বা শ্রেণিকক্ষে কাটানো, বাইরে বের হলেও শরীরের বড় অংশ ঢাকা থাকা এবং গাঢ় ত্বকে মেলানিন বেশি থাকা—এসব কারণে ত্বক প্রয়োজনমতো সূর্যের আলো নাও পেতে পারে। এর সঙ্গে বয়স, স্থূলতা, খাদ্যাভ্যাস, অন্ত্রে পুষ্টি শোষণের সমস্যা, লিভার বা কিডনির কিছু রোগ এবং নির্দিষ্ট কিছু ওষুধও ভিটামিন ডি-এর মাত্রায় প্রভাব ফেলতে পারে।
বাংলাদেশের ওপর করা গবেষণাতেও এই চিত্র দেখা গেছে। একটি গবেষণায় দেশের নারীদের প্রায় ৩৬ শতাংশের ২৫-হাইড্রক্সি ভিটামিন ডি-এর মাত্রা ৩০ ন্যানোমোল/লিটারের নিচে এবং প্রায় ৮০ শতাংশের মাত্রা ৫০ ন্যানোমোল/লিটারের নিচে পাওয়া গেছে। শিশু ও কিশোরদের নিয়েও করা বিভিন্ন গবেষণায় ভিটামিন ডি ঘাটতি ও স্বল্পতার উল্লেখযোগ্য হার পাওয়া গেছে।
শরীরে ভিটামিন ডি-এর মাত্রা কেমন আছে বা এর ঘাটতির কারণে অন্য কোনো সমস্যা হচ্ছে কি না, তা জানতে কয়েক ধরনের রক্ত পরীক্ষা করা যায়। তবে সব পরীক্ষা সবার প্রয়োজন হয় না। সাধারণত উপসর্গ, ঝুঁকির কারণ ও শারীরিক অবস্থা দেখে চিকিৎসক প্রয়োজনীয় পরীক্ষা নির্ধারণ করেন।
Vitamin D (25-OH) / 25-hydroxyvitamin D (25(OH)D): ভিটামিন ডি ঘাটতি বা স্বল্পতা বোঝার জন্য Vitamin D (25-OH) সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত এবং প্রধান পরীক্ষা। শরীরে মোট ভিটামিন ডি-এর অবস্থা সম্পর্কে এই টেস্ট থেকেই সবচেয়ে ভালো ধারণা পাওয়া যায়।
Vitamin D 1,25 Dihydroxy [1,25(OH)₂D: সাধারণ ভিটামিন ডি ঘাটতি নির্ণয়ের জন্য Vitamin D 1,25 Dihydroxy [1,25(OH)₂D পরীক্ষা করা হয় না। কিডনি, ক্যালসিয়াম বা প্যারাথাইরয়েড-সংক্রান্ত বিশেষ কিছু সমস্যায় চিকিৎসক এটি করতে বলতে পারেন।
Serum Calcium Test: ভিটামিন ডি-এর ঘাটতি বা অতিরিক্ত গ্রহণের কারণে রক্তে ক্যালসিয়ামের মাত্রা স্বাভাবিক আছে কি না, তা দেখতে Serum Calcium পরীক্ষা করা হয়।