প্রোটিন জাতীয় খাবারের তালিকা
September 3, 2026
September 3, 2026
প্রোটিনের কথা বললেই অনেকের মাথায় প্রথমে মাছ, মাংস বা ডিমের কথা আসে। কিন্তু প্রোটিন পাওয়ার উৎস এর চেয়েও অনেক বেশি। ডাল, ছোলা, সয়াবিন, দুধ, বাদাম, বীজ এমনকি কিছু শস্যজাত খাবারও প্রতিদিনের প্রোটিনের চাহিদা পূরণে সাহায্য করতে পারে।
আপনি যদি জানতে চান কোন খাবারে কত প্রোটিন আছে, কোনগুলো সহজে দৈনন্দিন খাবারে রাখা যায় এবং নিজের ওজন অনুযায়ী প্রতিদিন কতটা প্রোটিন প্রয়োজন হতে পারে, তাহলে এই তালিকাটি আপনার জন্য। এখানে পরিচিত ও সহজলভ্য প্রাণিজ এবং উদ্ভিজ্জ প্রোটিনের উৎসগুলো তাদের আনুমানিক প্রোটিনের পরিমাণ ও উপকারিতাসহ তুলে ধরা হয়েছে।
সুস্থ একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের জন্য সাধারণভাবে প্রতিদিন প্রতি কেজি শরীরের ওজনে প্রায় ০.৮ গ্রাম প্রোটিন প্রয়োজন ধরা হয়।
হিসাবটা খুবই সহজ। ধরা যাক, কারও ওজন ৭৫ কেজি। তাহলে—
৭৫ × ০.৮ = ৬০ গ্রাম
অর্থাৎ ৭৫ কেজি ওজনের একজন মানুষের দিনে মোটামুটি ৬০ গ্রাম প্রোটিন দরকার ।
নিজের দৈনিক প্রয়োজনের একটি সাধারণ ধারণা পেতে আপনার ওজনকে (কেজিতে) ০.৮ দিয়ে গুণ করতে পারেন।
তবে মনে রাখবেন, এই হিসাব সবার জন্য এক নয়। আপনার বয়স, শারীরিক পরিশ্রম, ব্যায়ামের ধরন, গর্ভাবস্থা, স্তন্যদান এবং সামগ্রিক স্বাস্থ্যের ওপর প্রোটিনের চাহিদা কমবেশি হতে পারে।
প্রোটিন জাতীয় খাবারের তালিকা
একটি বড় ডিমে সাধারণত প্রায় ৬ গ্রাম প্রোটিন থাকে। দুটি বড় ডিম থেকে প্রায় ১২ গ্রাম প্রোটিন পাওয়া যায়।
ডিমকে "কমপ্লিট প্রোটিন" বলা হয়, কারণ শরীরের দরকারি সব ধরনের অ্যামিনো অ্যাসিড এতে আছে। সাথে B12, কোলিন, কিছু খনিজ পদার্থ আর ভালো চর্বিও পাওয়া যায়। সকালের নাশতায় একটি বা দুটি সেদ্ধ ডিম, অমলেট বা পোচ রাখলেই দিনের শুরুতে সহজে ভালো মানের প্রোটিন যোগ করতে পারবেন।
প্রায় ৩ আউন্স বা ৮৫ গ্রাম মুরগির বুকের মাংসে প্রায় ২৭ গ্রাম প্রোটিন থাকে। চামড়া ছাড়া প্রায় ৮৫ গ্রাম (৩ আউন্স) মুরগির বুকের মাংসে মেলে প্রায় ২৭ গ্রাম প্রোটিন। চর্বি কম, প্রোটিন বেশি—এই কারণেই এটা এত জনপ্রিয়। এতে তুলনামূলক কম চর্বি থাকে এবং পেশির গঠন ও ক্ষয়পূরণের জন্য প্রয়োজনীয় অ্যামিনো অ্যাসিড পাওয়া যায়। দুপুর বা রাতের খাবারে ভাত, রুটি বা সালাদের সঙ্গে সেদ্ধ, গ্রিল বা হালকা মসলায় রান্না করা মুরগি রাখতে পারেন।
৯৩% লিন গ্রাউন্ড বিফের ৪ আউন্সে প্রায় ২৪ গ্রাম প্রোটিন থাকে। প্রোটিনের পাশাপাশি এখান থেকে আয়রন, জিঙ্ক আর B12-ও মেলে। তবে স্যাচুরেটেড ফ্যাট কম রাখতে চাইলে সারলয়েন বা টেন্ডারলয়েনের মতো লিন কাট বেছে নেওয়াই ভালো।
রুই, কাতলা, ইলিশ, তেলাপিয়া এবং অন্যান্য দেশীয় মাছ প্রোটিনের ভালো উৎস। অনেক মাছে প্রতি ১০০ গ্রামে প্রায় ১৮–২৫ গ্রাম প্রোটিন থাকতে পারে, যদিও মাছের ধরন অনুযায়ী পরিমাণ কিছুটা ভিন্ন হয়। প্রোটিনের পাশাপাশি আয়োডিন, সেলেনিয়াম আর কিছু মাছে ওমেগা-৩ও থাকে। তাই সপ্তাহজুড়ে একই মাছ না খেয়ে বিভিন্ন ধরনের মাছ পালা করে খেতে পারেন।
এক কাপ ২% দুধে প্রায় ৮ গ্রাম প্রোটিন থাকে, আর সেটাও কমপ্লিট প্রোটিন। এছাড়া ক্যালসিয়াম, ফসফরাস আর নানারকম ভিটামিনও পাওয়া যায়—হাড় আর দাঁত ভালো রাখতে যেগুলো দরকার।সকালের নাশতায়, ওটসের সঙ্গে বা রাতে আপনার খাদ্যাভ্যাস অনুযায়ী এক গ্লাস দুধ রাখতে পারেন।
আধা কাপ প্লেইন, ফ্যাট-ফ্রি গ্রিক ইয়োগার্টে প্রায় ১১ গ্রাম প্রোটিন। সাধারণ দইয়ের চেয়ে এতে প্রোটিন বেশি থাকে। ক্যালসিয়াম তো আছেই, সাথে লাইভ কালচার বা প্রোবায়োটিকও থাকতে পারে, যা পেটের স্বাস্থ্যের জন্য ভালো।
আধা কাপ ১% কটেজ চিজে প্রায় ১৪ গ্রাম প্রোটিন—প্রোটিন আর ক্যালসিয়াম, দুটোই একসাথে। রান্নার ঝামেলা নেই বলে সকালের নাশতায় বা টুকটাক খিদে মেটাতে বেশ কাজে দেয়। চেষ্টা করবেন কম সোডিয়ামের ভ্যারাইটি বেছে নিতে।
¾ কাপ টোফুতে প্রায় ১০ গ্রাম প্রোটিন থাকে। সয়াবিন থেকে তৈরি বলে এটাও কমপ্লিট প্লান্ট প্রোটিন। প্রোটিনের পাশাপাশি ক্যালসিয়াম আর আয়রনও কিছুটা মেলে। তরকারি, স্যুপ বা স্টির-ফ্রাই—যেকোনো কিছুতেই সহজে মিশে যায়।
আধা কাপ রান্না করা মসুর ডালে প্রায় ৯ গ্রাম প্রোটিন থাকে।বাংলাদেশে সবচেয়ে সহজলভ্য উদ্ভিজ্জ প্রোটিনের উৎস বলতে গেলে ডালের নামই আগে আসে। প্রোটিন ছাড়াও ফাইবার, ফোলেট, আয়রন আর নানা খনিজও এতে থাকে। ভাত বা রুটির সাথে নিয়মিত ডাল খাওয়াটাই আসলে প্রোটিন বাড়ানোর সবচেয়ে সহজ উপায়।
এক কাপ ছোলায় প্রায় ১৫ গ্রাম প্রোটিন—প্রোটিন আর ফাইবার দুটোরই ভালো উৎস, তাই পেট ভরা থাকে বেশিক্ষণ। সেদ্ধ করে, সালাদে, তরকারিতে, রোস্ট করে বা হামুস বানিয়ে—নানাভাবে খাওয়া যায়।
কুমড়ার বীজ, চিয়া সিড, তিসির বীজ ও সূর্যমুখীর বীজ অল্প পরিমাণেই খাবারে বাড়তি প্রোটিন যোগ করতে পারে।
কুমড়ার বীজ: ¼ কাপে প্রায় ৯ গ্রাম প্রোটিন, সাথে ম্যাগনেসিয়াম আর জিঙ্কও মেলে।
চিয়া সিড: ১ আউন্সে প্রায় ৫ গ্রাম প্রোটিন, ফাইবার আর উদ্ভিজ্জ ওমেগা-৩ও সাথে থাকে।
তিসির বীজ: ২ টেবিল চামচ গুঁড়া তিসিতে প্রায় ৪ গ্রাম প্রোটিন—ফাইবার আর ওমেগা-৩-এর জন্যও ভালো।
সূর্যমুখীর বীজ: প্রোটিনের পাশাপাশি স্বাস্থ্যকর চর্বি, ভিটামিন E আর খনিজ থাকে; পরিমাণ সার্ভিং সাইজের ওপর নির্ভর করে বদলায়।
আধা কাপ রোল্ড ওটসে প্রায় ৫ গ্রাম প্রোটিন থাকে। কার্বোহাইড্রেটের উৎস হিসেবেই ওটস বেশি পরিচিত, কিন্তু কিছুটা প্রোটিনও এতে আছে। এর সলিউবল ফাইবার পেট ভরা রাখতে এবং হৃদ্স্বাস্থ্যের জন্যও উপকারী।
মলা, কাচকি, ট্যাংরার মতো ছোট মাছগুলোও প্রোটিনের ভালো উৎস, প্রজাতি অনুযায়ী পরিমাণ কমবেশি হয়। এগুলোর একটা বাড়তি সুবিধা হলো কাঁটাসহ পুরোটাই খাওয়া যায়—ফলে প্রোটিনের পাশাপাশি ক্যালসিয়াম, জিঙ্ক আর অন্যান্য খনিজও মেলে।
চিনাবাদাম, কাঠবাদাম, কাজুবাদাম, আখরোট, নাট বাটার—এসবও প্রোটিনের সাথে স্বাস্থ্যকর চর্বি, ফাইবার আর ভিটামিন-খনিজের ভালো উৎস।
চিনাবাদাম: ১ আউন্স ড্রাই-রোস্টেড বাদামে প্রায় ৭ গ্রাম প্রোটিন।
কাঠবাদাম: ১ আউন্স র-তে প্রায় ৬ গ্রাম প্রোটিন।
পিনাট বাটার: ২ টেবিল চামচে প্রায় ৮ গ্রাম প্রোটিন।
আমন্ড বাটার: ২ টেবিল চামচে প্রায় ৭ গ্রাম প্রোটিন।
কাজু ও আখরোট: এতেও প্রোটিন থাকে, তবে বাদামের ধরন আর পরিমাণ অনুযায়ী তারতম্য হয়।
স্যামন, টুনা, সার্ডিন, ম্যাকারেল, ট্রাউট, চিংড়ি—এগুলো উচ্চমানের প্রোটিনের চমৎকার উৎস, সাথে ওমেগা-৩, সেলেনিয়াম, আয়োডিনও মেলে।
স্যামন: ৩ আউন্স রান্না করাতে প্রায় ১৯ গ্রাম প্রোটিন, সাথে ওমেগা-৩ যা হৃদয় আর মস্তিষ্কের জন্য ভালো।
টুনা: পানিতে সংরক্ষিত ক্যানড টুনার ৩ আউন্সে প্রায় ২০ গ্রাম প্রোটিন, সাথে স্যাচুরেটেড ফ্যাটও কম।
সার্ডিন: কাঁটাসহ খেলে প্রোটিনের সাথে ওমেগা-৩, ক্যালসিয়াম, ভিটামিন D-ও মেলে।
ম্যাকারেল: তৈলাক্ত মাছ, প্রোটিনের পাশাপাশি ওমেগা-৩ সমৃদ্ধ।
ট্রাউট: প্রোটিনের সাথে ওমেগা-৩ আর নানা ভিটামিন-খনিজও দেয়।
চিংড়ি: চর্বি কম, প্রোটিন বেশি, সাথে সেলেনিয়াম আর B12-ও থাকে।
পেশি ও টিস্যু তৈরি ও মেরামত করে। ব্যায়াম করার পর, দিনের স্বাভাবিক কাজকর্মে, এমনকি কোনো আঘাত পেলেও শরীরের ক্ষতিগ্রস্ত টিস্যু মেরামতের কাজটা প্রোটিনই করে থাকে।
কোষ গঠনের মূল উপাদান। শরীরের বেশিরভাগ কোষ ও টিস্যু আসলে প্রোটিন দিয়েই তৈরি—এটা শুধু পেশির ব্যাপার না, শরীরের গঠনগত ভিত্তিটাই প্রোটিনের ওপর দাঁড়িয়ে।
হরমোন ও এনজাইম তৈরিতে ভূমিকা রাখে। শরীরের বিপাকক্রিয়া, বৃদ্ধি আর নানা রাসায়নিক প্রক্রিয়া চালু রাখতে প্রোটিন দরকার হয়—এসব ছাড়া শরীরের ভেতরের কাজগুলো ঠিকমতো চলে না।
রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে শক্তিশালী রাখে। শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরি হয় প্রোটিন থেকেই, আর এই অ্যান্টিবডিই সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়াই করে।
পেট ভরা রাখতে সাহায্য করে। প্রোটিন খেলে সহজে খিদে পায় না, তাই সুষম খাদ্যতালিকায় প্রোটিন রাখলে ওজন নিয়ন্ত্রণেও সেটা পরোক্ষভাবে সাহায্য করতে পারে।
বৃদ্ধি ও বিকাশে অপরিহার্য। শিশু-কিশোরদের বেড়ে ওঠায়, গর্ভবতী নারীর শরীরে, এমনকি বয়স্কদের পেশি ধরে রাখতেও পর্যাপ্ত প্রোটিনের প্রয়োজন পড়ে।
দরকারে শক্তির উৎস হিসেবেও কাজ করে। যদিও শরীরের মূল জ্বালানি হিসেবে কার্বোহাইড্রেট বা চর্বিই বেশি ব্যবহৃত হয়, প্রয়োজনের সময় প্রোটিনও শরীর শক্তি হিসেবে খরচ করতে পারে।