অ্যালোভেরার উপকারিতা ও অপকারিতা: কীভাবে ব্যবহার করবেন, কী ঝুঁকি আছে?
October 1, 2026
October 1, 2026
অ্যালোভেরা, যা আমাদের কাছে ঘৃতকুমারী নামেও পরিচিত, একটি বহুবর্ষজীবী রসালো ভেষজ উদ্ভিদ। এর পুরু, মাংসল পাতার ভেতরে জমে থাকে স্বচ্ছ, শীতল জেল। এই জেলের প্রায় ৯৯ শতাংশই পানি, আর বাকি অংশে রয়েছে ৭৫টিরও বেশি সক্রিয় বায়ো-অ্যাক্টিভ উপাদান। ভিটামিন, খনিজ, পলিস্যাকারাইড ও এনজাইমে সমৃদ্ধ এই উদ্ভিদ শত শত বছর ধরে রূপচর্চা, স্বাস্থ্যরক্ষা ও প্রাকৃতিক চিকিৎসায় নির্ভরযোগ্য সঙ্গী হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
তাহলে এই উপাদানগুলো ঠিক কীভাবে আমাদের ত্বকের সতেজতা, শরীরের সুস্থতা ও সামগ্রিক স্বাস্থ্যে ভূমিকা রাখে? চলুন, এবার বিস্তারিত জেনে নিই।
অ্যালোভেরার ভেতরে থাকা স্বচ্ছ জেলে প্রায় ৯৯% পানি এবং বাকি অংশে ৭৫টিরও বেশি বায়ো-অ্যাক্টিভ উপাদান রয়েছে:
ভিটামিন: এটি শক্তিশালী অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ ভিটামিন A, C, E, ফলিক এসিড, কোলিন এবং B1, B2, B3 ও B6 এর একটি চমৎকার উৎস।
খনিজ/মিনারেল: এতে ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম, জিঙ্ক, ক্রোমিয়াম, সেলেনিয়াম, সোডিয়াম, পটাশিয়াম, কপার, আয়রন ও ম্যাংগানিজসহ প্রায় ২০ ধরনের খনিজ উপাদান বিদ্যমান।
অ্যামাইনো ও ফ্যাটি এসিড: মানবদেহের জন্য প্রয়োজনীয় ২২টি অ্যামাইনো এসিডের মধ্যে ১৮ থেকে ২০টিই এতে উপস্থিত, যার মধ্যে ৮টি অত্যাবশ্যকীয় অ্যামাইনো এসিড অন্তর্ভুক্ত; পাশাপাশি এতে বি-সিসটারোলের মতো দরকারী ফ্যাটি এসিডও রয়েছে।
পলিস্যাকারাইড (কার্বোহাইড্রেট): এতে এসিম্যানান ও গ্লুকোম্যানানের মতো বিশেষ সুগার মলিকিউল রয়েছে, যা টিস্যু পুনর্গঠন করতে এবং ত্বকে দীর্ঘসময় আর্দ্রতা ধরে রাখতে কার্যকর ভূমিকা রাখে।
এনজাইম: এতে ব্র্যাডিকাইনেজ, লিপেজ, অ্যামাইলেজ, ক্যাটলেজ ও অ্যালকালাইন ফসফেটেজের মতো বিভিন্ন এনজাইম থাকে, যা ত্বকের প্রদাহ কমাতে ও খাবার ভাঙতে সাহায্য করে।
প্রাকৃতিক অ্যান্টিসেপটিক ও অন্যান্য উপাদান: এতে স্যালিসিলিক এসিড, লিগনিন ও স্যাপোনিন রয়েছে, যা প্রাকৃতিক জীবাণুনাশক হিসেবে কাজ করে; এছাড়া পাতার নিচের কষে অ্যান্থ্রাকুইনোন (অ্যালাইন) নামের শক্তিশালী ল্যাক্সেটিভ উপাদান থাকে।
রুক্ষ, শুষ্ক ও প্রাণহীন ত্বককে নিমিষেই সতেজ করে তোলার জন্য অ্যালোভেরা অত্যন্ত কার্যকরী। জেলের ভেতরের ৯৯% পানি এবং গ্লুকোম্যানানের মতো বিশেষ বায়ো-অ্যাক্টিভ উপাদান ত্বকের গভীরে প্রবেশ করে আর্দ্রতা আটকে রাখে। ফলে কোনো কৃত্রিম কেমিক্যাল বা চিটচিটে ভাব ছাড়াই ত্বক সারাদিন থাকে নরম, তুলতুলে ও সতেজ।
দুর্ঘটনাবশত ছোটখাটো কাটাছ্যাঁড়া, হালকা ছিলে যাওয়া বা চামড়া উঠার সমস্যায় অ্যালোভেরা জেল এক দুর্দান্ত প্রাকৃতিক সমাধান। এর ভেতরের এসিম্যানান উপাদান ত্বকের গভীরের কোলাজেন উৎপাদন অনেক বাড়িয়ে দেয়, যা ক্ষতিগ্রস্ত টিস্যুকে খুব দ্রুত জোড়া লাগাতে সাহায্য করে এবং ত্বকের গঠন দ্রুত স্বাভাবিক করে তোলে।
কড়া রোদে ঘুরে ত্বকে পোড়া ভাব হয়েছে বা অ্যালার্জির কারণে চুলকানি হচ্ছে? অ্যালোভেরা জেলের একটি হালকা প্রলেপ আপনাকে তাৎক্ষণিক স্বস্তি দেবে। এর ব্র্যাডিকাইনেজ এনজাইম এবং ম্যাগনেসিয়াম ল্যাকটেট ত্বকের লালচে ভাব, ফোলা ও চুলকানি সৃষ্টিকারী উপাদানগুলোকে থামিয়ে দিয়ে মুহূর্তের মধ্যে এক চমৎকার সুদিং ও কুলিং অনুভূতি এনে দেয়।
অ্যালোভেরা কেবল ত্বকের সৌন্দর্যই বাড়ায় না, বরং ত্বকের সুরক্ষায় অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল ঢাল হিসেবেও কাজ করে। এতে থাকা সালফার, স্যালিসিলিক এসিড ও ফেনলিক উপাদান ত্বকের উপরিভাগে ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়ার বিস্তার ঘটাতে দেয় না, ফলে ত্বক থাকে যেকোনো ধরনের জীবাণুর আক্রমণ থেকে নিরাপদ।
যাঁরা ভারি কোনো ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করতে ভয় পান, তাঁদের জন্য অ্যালোভেরা জেল এক আদর্শ পছন্দ। এটি অত্যন্ত হালকা হওয়ায় লোমকূপ বন্ধ না করেই ত্বককে গভীরভাবে হাইড্রেট করে। ব্রণের লালচে ভাব ও ফোলা কমাতে এটি অত্যন্ত চমৎকার কাজ করে, যার ফলে নিয়মিত ব্যবহারে মুখের ত্বক দেখায় মসৃণ, সতেজ ও প্রাণবন্ত।
শেভ করার পর ত্বকে জ্বালাপোড়া করা, লাল হয়ে যাওয়া বা র্যাশ ওঠা অত্যন্ত সাধারণ একটি সমস্যা। অ্যালোভেরা জেল হতে পারে আপনার সবচেয়ে সেরা প্রাকৃতিক আফটার-শেভ লোশন। এর প্রাকৃতিকভাবে ঠান্ডা করার ক্ষমতা এবং টিস্যু নিরাময়কারী উপাদান শেভিং স্ট্রোকের ধাক্কা সামলে ত্বককে সাথে সাথে শান্ত ও সুরক্ষিত করে তোলে।
শুষ্ক, খসখসে চুল আর স্ক্যাল্পের বিশ্রী চুলকানি থেকে মুক্তি পেতে কেমিক্যালযুক্ত প্রডাক্টের বদলে অ্যালোভেরা বেছে নিন। এটি চুলের আর্দ্রতা লক করে চুলকে ভেতর থেকে সফট ও সিল্কি করে তোলে। পাশাপাশি স্ক্যাল্পের জমে থাকা মৃত কোষ পরিষ্কার করে মাথার ত্বককে রাখে একদম ফ্রেশ ও হেয়ার প্যাকের জন্য পারফেক্ট।
সুন্দর হাসির মূল চাবিকাঠি হলো সুস্থ মাড়ি ও পরিষ্কার দাঁত। মুখ ও মাড়ির যত্নে অর্গানিক অ্যালোভেরাযুক্ত মাউথওয়াশ বা জেল ব্যবহার করলে তা দাঁতের ক্ষতিকর প্লাক ও মাড়ির ফোলাভাব কমাতে দারুণ সাহায্য করে, যা আপনার প্রতিদিনের ডেন্টাল কেয়ারকে করে তোলে আরও শক্তিশালী।
নিয়ম মেনে পরিমিত মাত্রায় এবং সঠিক উপায়ে অ্যালোভেরার জুস প্রস্তুত করা হলে এটি পেটের সাময়িক অস্বস্তি ও কঠিন কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যায় বেশ কার্যকরী ভূমিকা রাখতে পারে। এর কিছু প্রাকৃতিক উপাদান পরিপাকতন্ত্রকে সচল করতে সাহায্য করে।
অ্যালোভেরায় বিদ্যমান ভিটামিন A, C, E এবং পলিফেনলের মতো শক্তিশালী অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট ত্বকের কোষগুলোকে অকাল বার্ধক্যের হাত থেকে রক্ষা করে। এটি বাইরের দূষণ ও রোদের কারণে হওয়া কোষের ক্ষতি মেটাতে সাহায্য করে, যা দীর্ঘমেয়াদে আপনার ত্বকের স্বাভাবিক উজ্জ্বলতা ও তারুণ্য ধরে রাখতে সহায়ক।
টাইপ-২ ডায়াবেটিসে আক্রান্তদের জন্য চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে ডায়েটে সঠিক নিয়মে অ্যালোভেরা রাখা হলে তা শরীরের ইনসুলিন সংবেদনশীলতা কিছুটা বাড়াতে পারে। ফলে নিয়মিত সঠিক লাইফস্টাইলের অংশ হিসেবে এটি রক্তে শর্করার সামঞ্জস্য বজায় রাখতে একটি সহায়ক উপাদান হিসেবে কাজ করে।
সমস্যা: ত্বকে অ্যালোভেরা জেল ব্যবহারের পর অনেকের চুলকানি, ত্বক লাল হয়ে যাওয়া, জ্বালা-পোড়া বা ছোট ছোট ফুসকুড়ি দেখা দিতে পারে।
কারণ: সেনসিটিভ ত্বকে অ্যালোভেরার কিছু প্ল্যান্ট এনজাইম ও বায়ো-অ্যাক্টিভ কম্পাউন্ডের প্রতি অতিসংবেদনশীল প্রতিক্রিয়া দেখা যায়।
করণীয়: যেকোনো ফেসপ্যাক বা জেল ব্যবহারে আগে কনুইয়ের ভাঁজে বা কানের পেছনে সামান্য লাগিয়ে ২৪ ঘণ্টার প্যাচ টেস্ট করে নেওয়া জরুরি।
সমস্যা: রক্তপাত হওয়া গভীর কাটাছেঁড়া, গুরুতর পোড়া বা সংক্রমিত ত্বকে অ্যালোভেরা জেল ব্যবহার করা বিপজ্জনক।
কারণ: অ্যালোভেরার জেল গভীর ক্ষতের ওপর একটি আস্তরণ তৈরি করে, যা ঘা শুকানোর স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় বাধা দিতে পারে এবং ক্ষতের ভেতরে ব্যাকটেরিয়া আটকে রেখে ইনফেকশন আরও ছড়িয়ে দিতে পারে।
সমস্যা: অ্যালোভেরা জুস বা কাঁচা পাতা খেলে তীব্র পেট ব্যথা, ডায়রিয়া ও বমি বমি ভাব হতে পারে।
কারণ: অ্যালোভেরা পাতার সবুজ স্তরের ঠিক নিচে থাকা হলুদ কষ বা অ্যালো লেটেক্স (Aloe Latex)-এ থাকে অ্যান্থ্রাকুইনোন (Anthraquinone/Aloin)। এটি পরিপাকতন্ত্রে শক্তিশালী জোলাপ বা ল্যাক্সেটিভ হিসেবে কাজ করে কোলনে অস্বাভাবিক সংকুচন তৈরি করে।
সমস্যা: নিয়মিত বা অতিরিক্ত পরিমাণে অ্যালোভেরা জুস খেলে শরীরে তীব্র পানিশূন্যতা ও দুর্বলতা দেখা দেয়।
কারণ: অনবরত ডায়রিয়া বা পাতলা পায়খানা হওয়ার ফলে শরীর থেকে প্রচুর পরিমাণে পানি ও জরুরি মিনারেল বের হয়ে যায়। বিশেষ করে রক্তে পটাশিয়ামের মাত্রা বিপজ্জনকভাবে কমে যেতে পারে, যা হৃৎপিণ্ড ও পেশির জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর।
সমস্যা: গর্ভবতী ও স্তন্যদানকারী মায়েদের জন্য অ্যালোভেরা গ্রহণ করা একদমই উচিত নয়।
কারণ: অ্যালো লেটেক্স জরায়ুর পেশি সংকুচিত করতে পারে, যার ফলে গর্ভপাত বা অকাল প্রসবের ঝুঁকি তৈরি হয়। এছাড়া বুকের দুধের মাধ্যমে এই উপাদান শিশুর শরীরে গিয়ে শিশুর পেটের অসুখ ঘটাতে পারে।
সমস্যা: ডায়াবেটিসের রোগীদের জন্য না বুঝে অ্যালোভেরা জুস খাওয়া ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
কারণ: অ্যালোভেরা প্রাকৃতিকভাবে রক্তের গ্লুকোজ লেভেল কিছুটা কমাতে সাহায্য করে। তবে ডায়াবেটিসের মূল ওষুধের (যেমন ইনসুলিন বা মেটফর্মিন) সাথে এটি খেলে সুগার হঠাৎ অতিরিক্ত কমে গিয়ে হাইপোগ্লাইসেমিয়া বা ব্ল্যাকআউট হতে পারে।
সমস্যা: কিডনির সমস্যা বা হৃদরোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের অ্যালোভেরা জুস এড়িয়ে চলা উচিত।
কারণ: লেটেক্সের কারণে শরীরে যে ইলেকট্রোলাইট বা পটাশিয়ামের ঘাটতি হয়, তা সরাসরি হার্টবিট অস্বাভাবিক করে তুলতে পারে এবং কিডনির ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করে এর ক্ষতি বাড়াতে পারে।
সরাসরি ফেস প্যাক হিসেবে: তাজা অ্যালোভেরা জেল পরিষ্কার মুখে হালকা হাতে গোল করে লাগিয়ে ১০–১৫ মিনিট রাখুন। জেল শুকিয়ে এলে ঠান্ডা পানি দিয়ে মুখ ধুয়ে ফেলুন। এটি ত্বককে তাৎক্ষণিকভাবে সতেজ, আর্দ্র ও তুলতুলে করে তোলে।
প্রাকৃতিক ময়েশ্চারাইজার হিসেবে: কৃত্রিম কেমিক্যাল ও অতিরিক্ত ক্রিম ব্যবহারের বদলে তাজা জেলের খুব পাতলা একটি প্রলেপ নাইট সিরাম বা লাইটওয়েট ময়েশ্চারাইজার হিসেবে প্রতিদিন ব্যবহার করা যায়।
সানবার্ন ও শেভিং-পরবর্তী স্বস্তিতে: রোদে পোড়া ত্বকের জ্বলুনি কমাতে কিংবা শেভ করার পর দেখা দেওয়া র্যাশ ও রেজর বার্ন প্রশমিত করতে আক্রান্ত স্থানে অ্যালোভেরা জেল অত্যন্ত কার্যকর।
প্যাচ টেস্ট নির্দেশিকা: মুখে প্রথমবার ব্যবহারের আগে কনুইয়ের ভাঁজে বা কানের পেছনে সামান্য জেল লাগিয়ে অন্তত ২৪ ঘণ্টা পর্যবেক্ষণ করুন। লালচে ভাব, চুলকানি বা জ্বলুনি না হলে নিশ্চিন্তে মুখে লাগাতে পারেন।
মিশ্রণ তৈরি: সমপরিমাণ তাজা অ্যালোভেরা জেল এবং নারকেল তেল (অথবা অলিভ অয়েল) একসাথে ভালোভাবে মিশিয়ে নিন।
ব্যবহারের পদ্ধতি: মিশ্রণটি স্ক্যাল্প থেকে চুলের ডগা পর্যন্ত ভালোভাবে ম্যাসাজ করে লাগান এবং ৩০ মিনিট অপেক্ষা করুন। এরপর কোনো মাইল্ড শ্যাম্পু দিয়ে চুল ধুয়ে ফেলুন। এটি চুলে প্রাকৃতিক নমনীয়তা ও উজ্জ্বলতা ফেরায় এবং স্ক্যাল্পের শুষ্কতা ও চুলকানি দূর করে।
অ্যালোভেরা জুস বা কাঁচা জেল হিসেবে খাওয়া সম্ভব, তবে এর অভ্যন্তরীণ ক্ষতিকর উপাদান বাদ দিতে নিখুঁত প্রস্তুতি প্রয়োজন।
যাদের খাওয়া সম্পূর্ণ নিষেধ: গর্ভবতী ও স্তন্যদানকারী মা, ছোট শিশু, ডায়াবেটিসের ওষুধ গ্রহণকারী, কিডনি বা হৃদরোগে আক্রান্ত ব্যক্তি এবং আগে থেকেই ডায়রিয়া বা পেটের সমস্যায় ভোগা রোগীদের চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অ্যালোভেরা খাওয়া একদমই উচিত নয়।
গভীর ক্ষতে অনুচিত: রক্তপাত হচ্ছে এমন গভীর কাটাছেঁড়া, তীব্র পোড়া বা সংক্রমিত ক্ষতে অ্যালোভেরা জেল সরাসরি লাগানো থেকে বিরত থাকুন।
অ্যালোভেরা (ঘৃতকুমারী) প্রকৃতির অনন্য উপহার, যা সঠিক নিয়মে ব্যবহার করলে আমাদের ত্বক, চুল ও দৈনন্দিন স্বাস্থ্য সুরক্ষায় অসাধারণ ভূমিকা রাখতে পারে। নিয়ম মেনে এবং সচেতনভাবে এটি ব্যবহারে আপনিও আপনার দৈনন্দিন লাইফস্টাইলে আনতে পারেন এক প্রাকৃতিক ও স্বাস্থ্যকর পরিবর্তন।
অ্যালোভেরা ত্বক ও চুলকে হাইড্রেটেড ও উজ্জ্বল রাখে, হালকা ক্ষত ও ত্বকের জ্বলুনি প্রশমনে সাহায্য করে, অ্যান্টিসেপটিক গুণাবলির কারণে মুখের স্বাস্থ্য ভালো রাখে এবং সঠিকভাবে প্রস্তুত করলে ত্বকের সুরক্ষা বাড়ায়।
ত্বকের গভীর আর্দ্রতা ধরে রাখতে, কোলাজেন উৎপাদন বাড়িয়ে ত্বকের স্থিতিস্থাপকতা বজায় রাখতে, ত্বকের ফুসকুড়ি ও জ্বলুনি কমাতে এবং ক্ষতিকর ফ্রি-র্যাডিক্যাল থেকে ত্বককে সুরক্ষা দিতে অ্যালোভেরা অত্যন্ত কার্যকর।
মুখের ত্বকের প্রাকৃতিকভাবে আর্দ্রতা জোগাতে, সানবার্ন ও প্রদাহ প্রশমিত করতে, অতিরিক্ত তেল নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করতে এবং বয়সের ছাপ বা সূক্ষ্ম রেখা কম দেখাতে অ্যালোভেরা প্রাকৃতিক ময়েশ্চারাইজার ও সিরাম হিসেবে কাজ করে।
প্রতিদিন নিয়ম মেনে তাজা অ্যালোভেরা জেল মাখলে মুখের ত্বক নরম, কোমল ও মসৃণ থাকে। এটি রোদে পোড়া ভাব দূর করে এবং ত্বককে প্রাকৃতিক দ্যুতি ও সতেজতা প্রদান করে।
প্রথমে মুখ ভালোভাবে ধুয়ে নিন। এরপর অ্যালোভেরা পাতা থেকে হলুদ কষ সম্পূর্ণ বাদ দিয়ে সংগৃহীত স্বচ্ছ জেল পাতলা করে মুখে লাগান। ১০–১৫ মিনিট পর সাধারণ ঠান্ডা পানি দিয়ে মুখ ধুয়ে ফেলুন। চাইলে রাতে লাইটওয়েট সিরাম হিসেবেও এর পাতলা স্তর ব্যবহার করা যায়।
পুরুষদের ত্বক সাধারণত একটু বেশি শক্ত ও তৈলাক্ত হয়। শেভ করার পর রেজর বার্ন, জ্বালা-পোড়া ও র্যাশ কমাতে এবং ধুলোবালি ও দূষণের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত ত্বক শান্ত রাখতে অ্যালোভেরা একটি দারুণ প্রাকৃতিক সমাধান।
সামান্য রোদ বা হালকা তাপে পোড়া ত্বকে অ্যালোভেরা বেশ আরামদায়ক, তবে খোলা, রক্তপাত হওয়া বা গভীর কাঁচা ক্ষতে সরাসরি গাছের জেল দেওয়া উচিত নয়; এতে সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ে।
খালি পেটে অ্যালোভেরা খেলেই বেশি উপকার পাওয়া যায়—এমন নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। বরং অনুপযুক্তভাবে প্রস্তুত করা জেল বা হলুদ কষসহ খেলে পেট মোচড়ানো, ডায়রিয়া বা পানিশূন্যতার মতো সমস্যা হতে পারে।
অ্যালোভেরার কিছু উপাদান নিয়ে গবেষণায় ইতিবাচক ফল মিললেও, পাতার হলুদ কষে থাকা ল্যাক্সেটিভ (Laxative) উপাদানের কারণে পেট পরিষ্কার হলেও এটিকে নিরাপদভাবে "হজমশক্তি বাড়ায়" বলা যায় না। নিয়মিত পেটের সমস্যা থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
অ্যালোভেরা খেলেই সরাসরি শরীরের ফ্যাট বা চর্বি কমে যায়—এমন শক্তিশালী বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। ল্যাক্সেটিভ প্রভাবে সাময়িকভাবে শরীর থেকে পানি বা মল কমে ওজন কম মনে হতে পারে, যা প্রকৃত ফ্যাট লস নয়।
অ্যালোভেরা শরীর থেকে "টক্সিন বের করে দেয়"—এমন দাবির পক্ষে যথেষ্ট বৈজ্ঞানিক প্রমাণের অভাব রয়েছে। আমাদের শরীরের যকৃৎ এবং কিডনি স্বাভাবিকভাবে বর্জ্য পদার্থ প্রক্রিয়াজাত ও অপসারণের প্রধান কাজ করে।
না, এটি একটি বৈজ্ঞানিক ভুল ধারণা। প্রাকৃতিক অ্যালোভেরায় মানুষের শরীরের উপযোগী কোনো সক্রিয় ভিটামিন B12 থাকে না। ভিটামিন B12 মূলত প্রাণিজ খাদ্যে পাওয়া যায়।
অ্যালোভেরায় থাকা উপাদান ও অ্যান্টি-ইনফ্লেমেটরি গুণাবলী ত্বকের প্রদাহ কমায়। নিয়মিত ব্যবহারে এটি ত্বকের হাইপারপিগমেন্টেশন বা কালো দাগ হালকা করতে এবং ক্ষতের নিরাময় দ্রুত করতে সাহায্য করে।
সাধারণত নিরাপদ, তবে সংবেদনশীল ত্বকে ব্যবহারের আগে অবশ্যই প্যাচ টেস্ট করা উচিত। কনুইয়ের ভাঁজে বা কানের পেছনে সামান্য জেল লাগিয়ে ২৪ ঘণ্টা কোনো জ্বালা বা অ্যালার্জি না হলে তবেই মুখে ব্যবহার করুন।
হলুদ কষে 'অ্যালাইন' (Aloin) নামক শক্তিশালী ল্যাক্সেটিভ থাকে, যা অন্ত্রে তীব্র বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি করে। এটি খেলে পেটে তীব্র ব্যথার পাশাপাশি শরীরের ইলেকট্রোলাইট ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে।
গাছের তাজা জেল পুরোপুরি কেমিক্যালমুক্ত হলেও প্রক্রিয়া করার সময় কষ রয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। অন্যদিকে মানসম্মত বাজারজাত জেলে কষ শোধন করা থাকে, তবে এতে প্রিজারভেটিভ বা সুগন্ধি থাকতে পারে। ব্যবহারের সুবিধার উপর ভিত্তি করে যেকোনোটি বেছে নেওয়া যায়।
অ্যালোভেরা মাথার ত্বকের আর্দ্রতা বজায় রাখে, শুষ্কতাজনিত চুলকানি ও খুশকি কমায় এবং চুলকে প্রাকৃতিকভাবে সিল্কি ও উজ্জ্বল করতে কন্ডিশনার হিসেবে কাজ করে।
গর্ভবতী বা স্তন্যদানকারী নারী, কিডনি বা হৃদরোগে আক্রান্ত ব্যক্তি, ডায়াবেটিসের ওষুধ গ্রহণকারী এবং পেটের ক্রনিক সমস্যায় ভোগাদের ক্ষেত্রে অ্যালোভেরা খাওয়ার আগে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।