হেলথ চেকআপ: কোন কোন টেস্ট নিয়মিত করবেন
October 7, 2026
October 7, 2026
তীব্র অসুস্থ না হওয়া পর্যন্ত আমরা ডাক্তারের চেম্বারে পা বাড়াতে চাই না। আবার কখনো চিকিৎসকের পরামর্শে কয়েকটি পরীক্ষা করিয়ে রিপোর্টে সবকিছু “স্বাভাবিক” দেখলেই নিশ্চিন্ত হয়ে যাই। কিন্তু ভালো থাকা মানেই যে শরীরের ভেতরে কোনো সমস্যা তৈরি হচ্ছে না—এমনটা সবসময় নয়। অনেক রোগ অনেক সময় দীর্ঘদিন কোনো স্পষ্ট উপসর্গ ছাড়াই থাকতে পারে।
এই কারণেই নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা গুরুত্বপূর্ণ। সঠিক সময়ে সঠিক পরীক্ষা করলে অনেক সমস্যা গুরুতর হওয়ার আগেই ধরা পড়তে পারে এবং প্রয়োজন হলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া যায়।তাই জেনে নিন আপনার বয়স ও ঝুঁকি অনুযায়ী কোন পরীক্ষাগুলো নিয়মিত করাবেন।
এই পরীক্ষাগুলো হলো আপনার শরীরের সাধারণ অবস্থা জানার প্রাথমিক উপায়। রোগ লক্ষণ দেখা দেওয়ার আগেই এগুলোকে নিয়মিত নজরদারিতে রাখা উচিত।
ক্যানসার প্রাথমিক অবস্থায় ধরা পড়লে তা পুরোপুরি নিরাময়যোগ্য। তাই আন্তর্জাতিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের নিয়ম মেনে সঠিক বয়সে পরীক্ষাগুলো করা উচিত:
জরায়ুমুখ ক্যানসার (নারীদের জন্য): ২১ থেকে ২৯ বছর বয়সে প্রতি ৩ বছর পর পর 'প্যাপ স্মিয়ার' (Pap Smear) পরীক্ষা এবং ৩০ থেকে ১৯৬৫ বছর বয়সে প্রতি ৫ বছর পর পর এইচপিভি (HPV) সহ প্যাপ টেস্ট করানো উচিত।
স্তন ক্যানসার (নারীদের জন্য): ৪০ বছর বয়স থেকে চিকিৎসকের পরামর্শে অথবা ৫০ বছর বয়স থেকে প্রতি ১-২ বছর পর পর 'ম্যামোগ্রাম' (Mammogram) করানো নিরাপদ।
কোলন ক্যানসার: নারী-পুরুষ নির্বিশেষে ৪৫ বছর বয়স থেকে প্রতি বছর মল পরীক্ষা Stool FIT অথবা ১০ বছর পর পর কোলোনোকপি করা উচিত।
প্রোস্টেট ক্যানসার (পুরুষদের জন্য): ৫০ বছর পার হলে চিকিৎসকের সাথে আলোচনা করে পিএসএ (PSA) রক্তের পরীক্ষা করানো যেতে পারে।
এই পরীক্ষাগুলো নিয়মিত চেক-আপের অংশ নয়। সুস্থ মানুষের অকারণে এগুলো করানোর প্রয়োজন নেই। নির্দিষ্ট কোনো লক্ষণ দেখা দিলে, বয়স বাড়লে বা ঝুঁকি থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শে এগুলো করানো হয়।
হৃদরোগের পরীক্ষা: বুকে মৃদু অস্বস্তি, বুক ধড়ফড় করা, অনিয়মিত হৃদস্পন্দন কিংবা সিঁড়ি দিয়ে ওঠার সময় মাত্রাতিরিক্ত হাঁপিয়ে যাওয়ার মতো উপসর্গ থাকলে হৃদযন্ত্রের সার্বিক অবস্থা বুঝতে ECG বা Echocardiogram করানো হয়।
এক্স-রে: ২ সপ্তাহের বেশি টানা কাশি, কাশির সাথে রক্ত যাওয়া, ফুসফুসে ইনফেকশন (যেমন নিউমোনিয়া বা যক্ষ্মা) বা শ্বাসকষ্টের সমস্যা থাকলে চিকিৎসকরা বুকের এক্স-রে করার পরামর্শ দেন।
হোল অ্যাবডোমেন আলট্রাসনোগ্রাম: পেটে দীর্ঘদিন ধরে বা তীব্র ব্যথা, পেট ফোলা ভাব, জন্ডিস, প্রস্রাবে রক্ত যাওয়া, ফ্যাটি লিভার, পিত্তথলি কিংবা কিডনিতে পাথর হয়েছে কি না তা সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করতে USG of Whole Abdomen পরীক্ষা করা হয়।
ভিটামিন পরীক্ষা: হাড় ও পেশিতে দীর্ঘদিনের ব্যথা কিংবা হাড় দুর্বল হয়ে পড়ার ক্ষেত্রে Vitamin D পরীক্ষা করা হয়। আর হাত-পা ঝিনঝিন করা, দীর্ঘদিনের অবশ ভাব, স্মৃতিশক্তি কমে যাওয়া বা রক্তস্বল্পতা থাকলে Vitamin B12 পরীক্ষা করা হয় (বিশেষ করে প্রবীণ, নিরামিষভোজী ও দীর্ঘদিন মেটফর্মিন বা এসিডিটির ওষুধ খাওয়া রোগীদের ক্ষেত্রে এটি প্রয়োজন হতে পারে)।
থাইরয়েড পরীক্ষা: কোনো কারণ ছাড়াই হঠাৎ ওজন অনেক কমে বা বেড়ে যাওয়া, মাত্রাতিরিক্ত ক্লান্তি, চুল পড়ে যাওয়া, গলার সামনের অংশ ফুলে যাওয়া এবং নারীদের ক্ষেত্রে অনিয়মিত মাসিক থাকলে থাইরয়েড হরমোনের অবস্থা বুঝতে TSH টেস্ট করা হয়।
টিউমার মার্কার: এগুলো সুস্থ মানুষের ক্যানসার স্ক্রিনিং বা সাধারণ চেক-আপের জন্য নয়। ক্যানসার আক্রান্ত রোগীর চিকিৎসা কেমন চলছে তা ট্র্যাক করতে বা রোগটি ফিরে এসেছে কি না তা মনিটর করতেই কেবল Tumor Markers ব্যবহৃত হয়।
হাড়ের ঘনত্ব পরীক্ষা: ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সী নারী এবং ৭০ বছর বা তার বেশি বয়সী পুরুষদের অস্টিওপোরোসিস (হাড় ক্ষয় রোগ) আছে কি না তা দেখতে DEXA Scan স্ক্যান করা হয়।
ইউরিক অ্যাসিড: পায়ের বুড়ো আঙুল বা শরীরের অন্যান্য জয়েন্টে তীব্র ব্যথা, হঠাৎ জয়েন্ট ফুলে লাল হয়ে যাওয়া অথবা কিডনিতে পাথরের ইতিহাস থাকলে রক্তে ইউরিক অ্যাসিডের মাত্রা (Serum Uric Acid) পরীক্ষা করা হয়।
হেপাটাইটিস বি ও সি: গর্ভধারণের শুরুতে, যেকোনো বড় অস্ত্রোপচারের আগে বা রক্ত গ্রহণের ইতিহাস থাকলে এটি করা হয়। তবে অনেক সময় কোনো উপসর্গ ছাড়াই এই সংক্রমণ শরীরে থাকতে পারে, তাই জীবনদশায় অন্তত একবার চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করে HBsAg ও Anti-HCV পরীক্ষা দুটি করিয়ে নেওয়া ভালো।
স্বাস্থ্য পরীক্ষা কখনোই ভয়ের বা টাকার অপচয়ের বিষয় নয়, বরং এটি দীর্ঘমেয়াদে সুস্থ থাকার একটি নির্ভরযোগ্য বিনিয়োগ। তবে পুরো শরীর অনর্থক স্ক্যান না করিয়ে, সঠিক বয়সে ও সঠিক সময়ে চিকিৎসকের সুনির্দিষ্ট পরামর্শ নিয়ে পরীক্ষা করানোই বুদ্ধিমানের কাজ।
Medical Disclaimer: প্রদত্ত তথ্যাবলী কেবল সাধারণ স্বাস্থ্য সচেতনতা এবং শিক্ষার উদ্দেশ্যে প্রকাশ করা হয়েছে। এটি কোনো পেশাদার চিকিৎসকের চিকিৎসা, রোগ নির্ণয় বা পরামর্শের বিকল্প নয়। আপনার শারীরিক অবস্থা, বয়স বা লক্ষণ অনুযায়ী যেকোনো স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানোর আগে বা নতুন কোনো চিকিৎসাপদ্ধতি শুরু করার আগে সর্বদা একজন নিবন্ধিত চিকিৎসকের সাথে পরামর্শ করুন। ঘরে বসেই অভিজ্ঞ ও নিবন্ধিত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে এবং যেকোনো স্বাস্থ্য পরীক্ষা সংক্রান্ত নির্দেশনা পেতে ‘আরোগ্য’ (Arogga) অনলাইন ডক্টর কনসালটেশন সেবা নিতে পারেন।